
কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলীয় জনপদ পেকুয়া ও চট্টগ্রামের বাঁশখালীকে ঘিরে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে সাগরপথে মানবপাচার চক্র। উন্নত জীবিকার প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া ঘুরিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর নাম করে গত দেড় মাসে এই দুই উপজেলা থেকে অন্তত তিন শতাধিক অসহায় নারী-পুরুষকে মৃত্যুঝুঁকির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। টেকনাফ ও চকরিয়াভিত্তিক একাধিক স্তরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই অভিনব পাচার প্রক্রিয়ার নেপথ্যে কাজ করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাচারকারী চক্রের সদস্যরা শুরুতে বিদেশে ভালো চাকরি এবং দ্রুত মালয়েশিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার প্রলোভন দেখায়। এরপর জনপ্রতি ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম নিয়ে আগ্রহীদের পেকুয়া, টৈটং, রাজাখালী, মহেশখালী ও বাঁশখালী থেকে মাইক্রোবাস বা হাইএস গাড়িতে করে টেকনাফ উপকূলে পাঠানো হয়। সাগরে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা ট্রলার বা নৌকায় তুলে তাদের মাঝসমুদ্রে আন্তর্জাতিক পাচার রুটে সক্রিয় আরেক দফা দালালের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী একাধিক পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার সীমান্তঘেঁষা এলাকায় ট্রলার পৌঁছানোর পর শুরু হয় দ্বিতীয় দফায় জনপ্রতি সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ টাকা আদায়ের চাপ। টাকা না দিলে যাত্রীদের আটকে রাখা, নির্যাতন বা অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রটির বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের কেরুণছড়ি এলাকার আবুল হোসেনকে কেন্দ্র করে একটি সক্রিয় মানবপাচার নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া গেছে।
স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, এই চক্রের মূল সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন আবুল হোসেনের মেয়ের জামাই এবং চকরিয়ার হারবাং ইউনিয়নের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। একসময় গাড়িচালক হিসেবে কাজ করা হাবিবুর রহমান প্রায় ২৩ মাস আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে টেকনাফ-চকরিয়াভিত্তিক পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। হাবিবুর রহমান বিদেশে থাকাকালে দেশের ভেতরে লোক সংগ্রহ ও অর্থ লেনদেনের দায়িত্ব পালন করতেন তার শ্বশুর আবুল হোসেন ও স্ত্রী হাসিনা বেগম।
অভিযোগ রয়েছে, হাবিবুর রহমান বর্তমানে দেশে ফিরে পেকুয়া ও বাঁশখালীর অসহায় মানুষদের টার্গেট করে বড় চালান প্রস্তুত করছেন এবং টেকনাফের কথিত জাফরসহ কয়েকজন মাঠপর্যায়ের সমন্বয়কারী নৌযানে তোলার বিষয়টি দেখভাল করছেন।
পাচার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংকিং চ্যানেল বা হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে থাকা দালালদের কাছে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে আবুল হোসেন ও তার মেয়ে হাসিনা বেগমের বিরুদ্ধে।
সাংবাদিক পরিচয় গোপন রেখে মালয়েশিয়া যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে আবুল হোসেন পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানান। তিনি স্বীকার করেন যে, তিনি ও তার মেয়ে টাকা গ্রহণ করেন এবং তার জামাই হাবিবুর রহমান বাকি সমন্বয় করেন।
খোঁজ নিতে গিয়ে মানব পাচারকারী চক্রের আরও একটি নেটওয়ার্কের তথ্য মিলেছে।
সূত্র জানায়, টৈটংয়ের গুধিকাটা এলাকার আবু তাহেরের ছেলে বত মিয়া এবং তার স্বজন বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার ফোরকানকে ঘিরে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বসে বত মিয়া নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন এবং দেশে অবস্থানরত তার স্ত্রী ও ছনুয়ার ফোরকান লোক সংগ্রহ ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয় করেন।
বত মিয়ার স্ত্রীর বিরুদ্ধে পেকুয়া, রাজাখালী ও মহেশখালী এলাকা থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এবং স্থানীয়দের মতে, গত দেড় মাসে তারা শতাধিক মানুষকে সাগরপথে পাঠিয়েছে।
এ ছাড়া পেকুয়ার টৈটংয়ের খুনিয়া ভিটা এলাকার মনুর ছেলে আনসারের বিরুদ্ধেও সরাসরি লোক সংগ্রহ ও সাগরপথে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, আনসার কমিশনভিত্তিক লোক নিয়োগ দিয়ে প্রচার চালান এবং তার মাধ্যমে অন্তত ৫০ জনের বেশি মানুষ পাচার হয়েছে। এই পাচার চক্রে বাঁশখালীর ছনুয়া এলাকার শফির নামও উঠে এসেছে।
পরিচয় গোপন রেখে শফির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মালয়েশিয়া যাওয়ার বিষয়ে কিছুদিন অপেক্ষা করতে বলেন। পাশাপাশি টৈটং ইউনিয়নের চেপ্টামুরা এলাকার বাসিন্দা এক মালয়েশিয়া প্রবাসীর বিরুদ্ধেও থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া সীমান্ত থেকে অবৈধ লোকজনকে পরবর্তী গন্তব্যে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে বিদেশ থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোন করে হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের কারণ জানতে চান এবং মানবপাচারের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
কোস্টগার্ড মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, কয়েকটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র বিদেশে উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন, উচ্চ বেতনের চাকরি এবং অল্প খরচে বিদেশ যাত্রার প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিকদের মালয়েশিয়ায় সাগর পথে পাচারের চেষ্টা করছে। গত ১ মার্চ ভোরে সাগরপথে ট্রলারযোগে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সময় সেন্টমার্টিনের গভীর সমুদ্র এলাকা থেকে ১৫৩ জনকে উদ্ধার করেছে কোস্টগার্ড। এসময় পাচারের সঙ্গে জড়িত মানবপাচারকারী চক্রের ১৫ সদস্যকে আটক করা হয়। মানবপাচার রোধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
