
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদ রাঙ্গাপানি এলাকায় প্রতিষ্ঠিত রাঙ্গাপানি পাড়া সর্বজনীন বৌদ্ধবিহারে স্থানীয় কয়েকটি গ্রামের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মারমা ভাষার বর্ণমালা শিক্ষায় বিশেষ পাঠদান করে আসছেন বিহারাধ্যক্ষ উসারা ভিক্ষু। তাঁর এই মহতী উদ্যোগে শতাধিক শিক্ষার্থী একদিকে যেমন মারমা ভাষায় বর্ণমালা লিখতে ও পড়তে দক্ষতা অর্জন করছে, অন্যদিকে তারা ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাও লাভ করছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১৯১০ সালে প্রতিষ্ঠিত শতবর্ষী এই বিহারের একটি কক্ষে বিহারাধ্যক্ষ উসারা ভিক্ষুসহ মারমা ভাষা চর্চায় বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন তিনজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মারমা বর্ণমালা শেখাচ্ছেন। সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা স্কুলের অবসর সময়ে পরিচালিত এই বিশেষ পাঠদান কার্যক্রমে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরাও বেশ উচ্ছ্বসিত।
এ বিষয়ে শিক্ষার্থী নুংচিং মারমা ও ক্রাজাই মারমা জানায়, তারা মুখে মারমা ভাষায় কথা বলতে পারলেও তাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মারমা বর্ণমালা পড়তে ও লিখতে পারত না। তবে এখানে ক্লাস করে নুংচিং মারমা ও ক্রাজাই মারমা এখন নিজ মাতৃভাষার বর্ণমালা লিখতে ও পড়তে পারছে এবং পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মীয় নানা বিষয়ের ওপরও বিশেষ জ্ঞান অর্জন করছে। অন্যদিকে, অভিভাবক অংগ্য মারমা বলেন, এই শ্রেণি কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন করছে ছেলেমেয়েরা। তবে সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে বলে অংগ্য মারমা উল্লেখ করেন।
সার্বিক বিষয়ে বিহারাধ্যক্ষ উসারা ভিক্ষু জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এই বিহারের দায়িত্বে আছেন। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও নিজস্ব মাতৃভাষায় শিশুদের বিশেষ দক্ষ করে গড়ে তুলতেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে পর্যাপ্ত কক্ষ ও শিক্ষা উপকরণের সংকট রয়েছে জানিয়ে উসারা ভিক্ষু আরও বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিলুপ্তপ্রায় মারমা ভাষার বর্ণমালা চর্চায় আরও বেশি ভূমিকা রাখা সম্ভব।
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার সকালে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সদস্য সাথোয়াইপ্রু চৌধুরী। এ সময় তিনি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। সাথোয়াইপ্রু চৌধুরী বলেন, মারমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা আছে, তবে চর্চার অভাবে এই ভাষার বর্ণমালা আজ বিলুপ্তির পথে। তাই এই মাতৃভাষার বর্ণমালা টিকিয়ে রাখতে প্রতিটি গ্রামে মারমা বর্ণমালা শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা জরুরি বলে সাথোয়াইপ্রু চৌধুরী মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) পাহাড় ও সমতলে ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করেছে। ২০১৭ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক্-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শিশুদের মাতৃভাষার বই দেওয়া হচ্ছে। চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে তিন পার্বত্য জেলায় ৬৬ হাজার ৬৮৭ শিশুকে পাঠ্যবই দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে চাকমা ভাষায় ৩৫ হাজার ১৪৫, মারমা ভাষায় ১৮ হাজার ৫১৩ ও ত্রিপুরা ভাষায় ১২ হাজার ৭৫৬ জন শিশু রয়েছে।
