নাড়ির টানে শেকড়ে ফেরা: উৎসবের আনন্দ ও ত্যাগের গল্প


বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও শান্তিকামী দেশ। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দেশের এক প্রান্ত টেকনাফ থেকে অন্য প্রান্ত তেঁতুলিয়ার দূরত্ব অনেক। ৬৪টি জেলা নিয়ে গঠিত এই ভূখণ্ডের মানুষ চাকরি, ব্যবসা বা জীবনের তাগিদে দেশের বিভিন্ন স্থানে, এমনকি বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন।

এই ভূখণ্ডে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন। মুসলমানদের ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা, হিন্দুদের দুর্গাপূজা, বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা এবং খ্রিষ্টানদের বড়দিন এর মধ্যে অন্যতম। প্রতিটি ধর্মের মানুষই চান এই আনন্দের দিনগুলো তাঁদের পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে উদ্‌যাপন করতে।

উৎসবের ছুটিতে পরিবার-পরিজনের কাছে ফেরার এই তীব্র আকাঙ্ক্ষাকেই বলে নাড়ির টান। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, স্টিমার বা ট্রাকে চড়ে, যেকোনো উপায়েই হোক না কেন, মানুষ শেকড়ের কাছে ফিরতে চায়। বাসের টিকিটের জন্য দীর্ঘ লাইন, ট্রেনের আগাম টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া—সব বাধা পেরিয়ে এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে উঠে হলেও প্রিয়জনের মুখ দেখার জন্য মানুষের আপ্রাণ চেষ্টা থাকে।

কয়েক দিন আগে ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখলাম; এক লোক সময়মতো ট্রেন ধরতে না পেরে দৌড়াতে দৌড়াতে এক বগি, দুই বগি পার হয়ে তৃতীয় বগিতে গিয়ে কোনোমতে উঠে পড়লেন। ভেতরের লোকজন তাঁকে দেখে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “ভাই, খুশি তো?” লোকটি তখন চোখেমুখে আনন্দের ছাপ নিয়ে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ ভাই, ট্রেনে উঠতে পেরেছি, এটাই তো বড় কথা!”

তবে সবার ভাগ্যে এই আনন্দ জোটে না। অনেক চেষ্টার পরও ছুটি না মেলায় কিংবা আর্থিক সংকটের কারণে অনেকের আর বাড়ি ফেরা হয় না। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট নিয়ে তাঁরা উৎসব পালন করেন, বড়জোর মোবাইলে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটান। আবার দায়িত্বের চাপে অনেকে সেই কথা বলার সুযোগটুকুও পান না।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি সেবায় নিয়োজিত কর্মীরা এবং প্রবাসীরা ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের সঙ্গে উৎসবে শামিল হতে পারেন না।

যাঁরা নানা উপায়ে বাড়ি ফেরার চেষ্টা করেন, যাতায়াতের পথে অনেক সময় তাঁদের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার শিকার হতে হয়। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে অনেকের দামি জিনিসপত্র চুরি বা হারিয়ে যায়।

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো যেন উৎসবের আনন্দকে বিষাদে রূপ দিতে না পারে, সেদিকে আমাদের গভীর মনোযোগ রাখতে হবে। চোখ-কান খোলা রেখে সতর্কতার সঙ্গে বাড়ি ফিরে উৎসবের আনন্দ উপভোগ করা উচিত।

সবাই যেমন সুন্দর মন নিয়ে কর্মস্থল থেকে বাড়িতে আসেন, ঠিক তেমনি আনন্দ শেষে নিরাপদে নিজ নিজ কর্মস্থলে বা অস্থায়ী বাসস্থানে ফিরে যাবেন—এটাই প্রত্যাশা।

সবাইকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা, ঈদ মোবারক! এই ঈদ সবার জীবনে আনন্দ বয়ে আনুক।

উৎসর্গ:
দেশের সব জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‍্যাব, আনসার ব্যাটালিয়ন, ফায়ার সার্ভিস, বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্য, সংবাদকর্মী এবং আমাদের প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা—যাঁরা দেশ ও দশের স্বার্থে নিজ কর্মস্থলে অবিচল থেকে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারছেন না, আজকের এই লেখাটি তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় উৎসর্গ করলাম।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।