পলাশী থেকে বিশ্বযুদ্ধ: ইতিহাস ও ধ্বংসযজ্ঞ থেকে আমাদের কী শেখার আছে?


আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে শুরু করা যাক—”আমি ভেড়ার নেতৃত্বে থাকা সিংহবাহিনীকে ভয় পাই না, কিন্তু সিংহের নেতৃত্বে থাকা ভেড়ার পালকে ভয় পাই।” এই কথার ভেতরে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক সত্য লুকিয়ে আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম খুনের ঘটনা ঘটেছিল হাবিল ও কাবিলের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে আজ পর্যন্ত কত যে যুদ্ধ হয়েছে, তার অনেক কিছুই হয়তো আমাদের অজানা। আদিম যুগের যুদ্ধগুলো পরিচালিত হতো ঢাল, তলোয়ার, বর্শা আর তীর-ধনুক দিয়ে। বিশ্বখ্যাত বীর চেঙ্গিস খান পুরো পৃথিবী দখল করতে চেয়েছিলেন। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটও বিশ্বজয়ের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন, কিন্তু সামান্য একটি মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু ঘটে।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা দেখি, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি সামান্য কিছু অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করেন এবং লক্ষণ সেন পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে নদীয়া চলে যান। এরপর ভারত উপমহাদেশে সম্রাট বাবর থেকে শুরু করে টিপু সুলতান—অনেকেই যুদ্ধ করেছেন। টিপু সুলতান ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে প্রাণ হারান এবং সে সময়ই এই অঞ্চলে সর্বপ্রথম আগ্নেয়াস্ত্রের বা রকেটের ব্যবহার দেখা যায়। শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের পরিণতিও হয়েছিল করুণ।

অবশেষে ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে মীরজাফর আলী খানের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে আমরা ২০০ বছরের জন্য ইংরেজদের দাসে পরিণত হই। ইতিহাসের এই চরম বেইমানির কারণে ১৭৫৭ সালের পর থেকে আজ অবধি কেউ নিজের সন্তানের নাম ‘মীরজাফর’ রেখেছেন বলে মনে হয় না!

এরপর আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়ার এক যুবরাজকে হত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ দীর্ঘ চার বছর পর ১৯১৮ সালের নভেম্বরে শেষ হয়। এই যুদ্ধের মূল শক্তি ছিল ফ্রান্স, ব্রিটেন, জার্মানি ও রাশিয়া।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায়। অ্যাডলফ হিটলারের একটি কথিত উক্তি রয়েছে, “আমি চাইলে সব ইহুদিকে হত্যা করতে পারতাম, কিন্তু কিছু ইহুদি বাঁচিয়ে রেখেছি, যাতে পরবর্তী প্রজন্ম বুঝতে পারে ইহুদি জাতি কী।” হিটলার, ইতালির মুসোলিনি এবং তাদের মিত্রদের আগ্রাসনে ১৯৩৮ সাল থেকে বিশ্ব আবার উত্তাল হতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রায় দেড় কোটি সেনাসদস্য নিহত এবং আড়াই কোটিরও বেশি আহত হয়। সাধারণ মানুষ প্রাণ হারায় চার কোটিরও বেশি।

অন্যদিকে এশিয়া অঞ্চলে জাপান তখন একের পর এক চীনা ভূখণ্ড দখল করতে ব্যস্ত। জাপানিদের আগ্রাসনে দুই থেকে তিন লাখ চীনা নাগরিক নিহত হন এবং হাজার হাজার নারী ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে অবশেষে পরাস্ত হয়ে হিটলার আত্মহত্যা করেন। আর প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে জাপানের হিরোশিমায় ‘লিটল বয়’ এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এর পরপরই ২ সেপ্টেম্বর জাপান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

সেই সময়কার বোমার চেয়ে বর্তমান পরাশক্তিদের হাতে থাকা মারণাস্ত্রগুলো শতগুণ বেশি শক্তিশালী। আজ তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, বাঙ্কার বাস্টার বোমা, আন্তর্মহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র, হাইড্রোজেন বোমা, ফসফরাস ও গুচ্ছ বোমার মতো ভয়ংকর সব অস্ত্র। এসব অস্ত্র যদি কোনোদিন একযোগে ব্যবহার করা হয়, তবে আমাদের এই নীল গ্রহটি মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত হবে।

বর্তমানের যুদ্ধকৌশলও পাল্টে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে, লোকেশন ট্র্যাক করে আত্মঘাতী ড্রোন বা কামিকাজে ড্রোন দিয়ে ঘরে বসে ভিডিও গেম খেলার মতো দূরনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ চালানো হচ্ছে। আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একের পর এক প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। রাষ্ট্রনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, অবুঝ শিশু এবং কীটপতঙ্গসহ নিরীহ প্রাণীরাও এই আগ্রাসনের শিকার হচ্ছে। এত বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং জলবায়ু চরমভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। শান্ত মহাসাগরগুলোর তলদেশেও এখন ওঁত পেতে আছে ভয়ংকর সব সাবমেরিন।

কিসের জন্য এত যুদ্ধ? কিসের এত অভাব মানুষের? আমরা আর যুদ্ধ চাই না, আমরা শান্তি চাই! স্রষ্টা আমাদের এই নীল গ্রহটিকে রক্ষা করুন, আমিন।

উৎসর্গ: পুরো বিশ্বের আগামী প্রজন্মের সকল শিশুর প্রতি।

পরিশিষ্ট: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া জাপান কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলেছে এবং বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। গত বিশ্বকাপে খেলা শেষে পুরো ফুটবল মাঠ পরিষ্কার করে তারা প্রমাণ করেছে যে তারা কতটা সভ্য জাতি। অন্যদিকে, চীনও তাদের প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের মাধ্যমে আজ নিজেদের সুপারপাওয়ার ও সভ্য জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ধ্বংস নয়, বরং গঠনমূলক কাজই একটি জাতিকে মহান করে তোলে।

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।