পোরকরায় ব্যতিক্রমী ঈদ জামাত, নারীদের মিলনমেলায় পরিণত ঈদগাহ


সারা দেশের মতো নোয়াখালীতেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলার মতো নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার পোরকরায় ঈদের এই জামাত অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানে পুরুষ মুসল্লির পাশাপাশি নারী ও শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। ইসলামের স্বর্ণযুগের নারী-পুরুষের সাম্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যেন এই ঈদগাহে ফুটে উঠেছিল। নানা রঙের কাগজ আর বেলুন দিয়ে সাজানো ঈদগাহ যেন সব বয়সী নারী, পুরুষ আর শিশুদের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।

আজ শনিবার (২১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৮টায় চাষীরহাট নূরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার মুসল্লি এই জামাতে অংশগ্রহণ করেন। এ সময় কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায় স্কুলমাঠ। এই ঈদের জামাতে খতিব হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা মহিব্বুর রহমান।

ঈদের জামাতে অংশগ্রহণ করতে নোয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলাসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকেও অনেকে এসেছেন। তাঁদেরই একজন হাসনা আক্তার। হাসনা আক্তার তাঁর স্বামীর সঙ্গে তিন সন্তানসহ এসেছেন ঈদের জামাতে। কথা হলে হাসনা আক্তার জানান, তাঁর বাবার বাড়ি সোনাইমুড়ীর পোরকরা গ্রামেই। গত দুই বছর ধরে এখানে খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছরও তিনি এই জামাতে নামাজ পড়তে এসেছিলেন। এ বছরও এসেছেন এবং আগের চেয়ে নারী মুসল্লির সংখ্যা বেড়েছে বলে হাসনা আক্তার যুক্ত করেন।

ষোড়শী তিন কিশোরী হাতে জায়নামাজ নিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্প করতে করতে প্রবেশ করছেন ঈদগাহে। তারা জানায়, এবারই প্রথম তারা ঈদুল ফিতরের জামাতে অংশ নিচ্ছে। এর আগে কখনো এভাবে ঈদগাহে নামাজ পড়েনি তারা। তারা শুনেছে এই ঈদগাহে নারীদের জন্য আলাদা প্যান্ডেল, ওয়াশরুম, ওজুর ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা রয়েছে। তাই বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে নামাজ পড়তে এসেছে তারা।

একই পথ দিয়ে নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে নামাজের উদ্দেশ্যে আসছিলেন ষাটোর্ধ্ব কুলসুম বিবি। কুলসুম বিবিও জীবনে প্রথম জামাতে ঈদের নামাজ পড়বেন। কুলসুম বিবি জানালেন, ছোটবেলায় বাবা-ভাইয়েরা ঈদের নামাজে এলেও তাঁকে নেওয়া হতো না। তবে বিভিন্ন হাদিস থেকে তিনি জেনেছেন, রাসুল (সা.)-এর সময়ে নারীরা মসজিদে নামাজ পড়তেন, হজে যেতেন এবং ঈদের জামাতেও নারীরা অংশগ্রহণ করতেন। নারীদের সঙ্গে ঈদগাহে জামাতে নামাজ পড়তে আসতে পারায় ছোটবেলার ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে বলেও কুলসুম বিবি জানান।

এমনই নানা অনুভূতি নিয়ে নারীরা এসেছিলেন চাষীরহাট নূরুল হক উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে ঈদের জামাতে। নামাজ শেষে কেউ একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করছেন, কেউবা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছেন দোয়ার মোনাজাতে। এই জামাতে নারীদের প্যান্ডেলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন বেশ কয়েকজন নারী। তাঁরা এখানকার শৃঙ্খলা ও নারী মুসল্লিদের দেখভাল করার দায়িত্বে রয়েছেন। তাঁদের মধ্য থেকে তাহমিনা খানম রুপা জানান, এখানে নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ এবং আলাদা প্যান্ডেল রয়েছে। বেশ কয়েক বছর ধরে পোরকরার শহিদী জামে মসজিদের পক্ষ থেকে এমন আয়োজন করা হচ্ছে। এর আগে মসজিদ প্রাঙ্গণে ঈদের জামাত হতো এবং এখন স্কুলের মাঠে তা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে তাহমিনা খানম রুপা জানান।

সামাজিক কোনো বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তাহমিনা খানম রুপা জানান, একসময় অনেকে নারীদের জুমায় অংশগ্রহণ ও ঈদের জামাত নিয়ে বিরোধিতা করতেন। তবে এখন অনেকেই এটি সমর্থন করছেন। অনেক দেশের বিভিন্ন স্থানে নারীরা মসজিদে ও ঈদগাহে জামাতে অংশগ্রহণ করছেন। তাছাড়া প্রকৃত ইসলামের যুগে নারীরা রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করেছেন, নামাজ ও হজে অংশ নিয়েছেন। এখানেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।

নামাজ শেষে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে মুসল্লিদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। নামাজে যেসব শিশু অংশগ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে যারা রোজা রেখেছে, সেসব বাচ্চাকে ঈদগাহের খতিব মাওলানা মহিব্বুর রহমানের পক্ষ থেকে পুরস্কারও দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে নারী, শিশু ও পুরুষ মুসল্লিদের মাঝে ঈদের আনন্দের এক ভিন্ন আবহ প্রকাশ পায় এই ঈদগাহে।

ঈদের জামাতে নানা ব্যতিক্রমী আয়োজন নিয়ে কথা হলে আয়োজক কমিটির দায়িত্বে থাকা নিজাম উদ্দিন জানান, গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে তাঁরা এই আয়োজন করছেন। এখানে ইসলামের নীতি অনুসরণ করে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রথম দিকে বিভিন্ন প্রতিকূলতা থাকলেও এখন দেশবরেণ্য বিভিন্ন আলেম ঈদের জামাতে নারীদের অংশগ্রহণের পক্ষে কথা বলছেন বলে নিজাম উদ্দিন মন্তব্য করেন।