
দেশে প্রায় এক মাস ধরে জ্বালানি তেলের সংকট চলছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি এখনো কমেনি। চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও ঝুলছে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড। খাত-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরবরাহ অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি অবৈধ মজুত ও কালোবাজারির কারণে এই সংকট ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এর সত্যতাও মিলেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদিন অবৈধ তেল মজুত জব্দ করার পাশাপাশি কালোবাজারে বিক্রির দায়ে জরিমানাও করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্বাভাবিক দর বেড়েছে। চলতি মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে (বিপিসি) অন্তত আড়াই হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ করতে হয়েছে এবং আমদানির পেছনে সরকার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৬৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে। এছাড়া এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত আড়াই হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভর্তুকির চাপ কমাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। যদিও দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, দুই বছর বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু শুক্রবার সাংবাদিকদের জানান, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই, বরং গত বছরের চেয়ে বেশি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু উল্লেখ করেন, মানুষ আতঙ্কে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছে। সেই সঙ্গে কালোবাজারিরা তেলের অবৈধ মজুত করে সংকট সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যারা তেল নিয়ে কারসাজি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, সরকার সংকট নেই বললেও বাস্তবে জ্বালানি তেল নিয়ে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, যার মানে কোথাও ঘাপলা আছে। বিষয়টি দ্রুত খুঁজে বের করে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া দরকার বলে মনে করেন ড. ইজাজ হোসেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সংকটের জন্য সরকার দায়ী নয়। ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ জ্বালানি নিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারলে আমাদের তা করতে সমস্যা কোথায়, সে প্রশ্ন তুলে প্রকৃত বাস্তবতা জনগণকে জানানো উচিত বলে মন্তব্য করেন ড. ইজাজ হোসেন। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও আরও সাশ্রয়ী ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি
দেশের বিভিন্ন স্থানে রাস্তায় পরিবহনকারী লরি থেকে তেল বিক্রি এবং অবৈধ মজুতের প্রমাণ মিলেছে। শুক্রবার সকালে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০টি ড্রামে মজুত করা আনুমানিক ছয় হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া জ্বালানি তেল মজুত রেখে গ্রাহকের কাছে বিক্রি না করার অভিযোগে শুক্রবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন জব্দ করা হয়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতে শেরপুর শহরের একটি আবাসিক ভবনে ডিজেল মজুত করার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকেও জরিমানা করা হয়।
তথ্য দিলে পুরস্কার
জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট রোধে অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত করার সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে। সরবরাহ তদারকি করতে এরই মধ্যে দেশের সব জেলায় ভিজিলেন্স টিম গঠন করা হয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব
বিশ্ববাজারে জ্বালানির অস্থিরতা ও আমদানি খরচের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনা করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকভাবে ১০ শতাংশ এবং ধাপে ধাপে তা ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা চলছে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিটপ্রতি খরচ ২৭ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। গ্যাস সংকট ও এলএনজি আমদানির খরচ বাড়ার ফলে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং খরচ আরও বাড়ছে।
ভারত থেকে ডিজেল ও এলএনজি আমদানি
জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও মজুত স্বাভাবিক রাখতে শুক্রবার ভারত থেকে পাঁচ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইন দিয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেল হেড ডিপোতে সরবরাহ করা হয়েছে। শনিবার থেকে ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে আরও সাত হাজার টন ডিজেল সরবরাহ শুরু হবে। অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে দুটি জাহাজে করে এক লাখ ২৩ হাজার টন এলএনজি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছেছে। আগামী ৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এলএনজি আসার কথা রয়েছে বলে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা ও জনভোগান্তি
শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। শনিবার থেকেই জ্বালানি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল। তবে সরকার ও মালিকপক্ষের আশ্বাসের পরও পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সারি কমেনি। বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবারও লম্বা লাইন দেখা গেছে।
