
নদীর প্রাণ ফেরাতে এবং দখল-দূষণ মুক্ত জলাভূমি নিশ্চিত করতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয় নদী রক্ষা কমিশন আইন সংশোধনের যে সাহসী প্রস্তাব এনেছে, তা বাস্তবায়িত হলে এই কমিশন আর কেবল একটি কাগুজে বা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে না। বিদ্যমান আইনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে একে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা সরাসরি নদী, খাল এবং সমুদ্র উপকূল রক্ষায় অভিভাবকের ভূমিকা পালন করবে।
সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো, প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী এই কমিশন এখন শুধু সুপারিশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং অবৈধ দখলদার উচ্ছেদ এবং নদী দূষণকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা করার আইনি ক্ষমতা লাভ করবে। নদী বা খালের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কমিশন সরকারকে যে উন্নয়নমূলক পরামর্শ দেবে, কোনো কারণে সরকার তা পালন না করলে তার সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে জাতীয় সংসদে। এটি স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার এক নতুন নজির স্থাপন করবে। যদিও কিছু সরকারি সংস্থার মধ্যে এই ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে, তবুও দেশের প্রকৃতির ধমনী এই নদীগুলোকে বাঁচাতে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন সময়ের দাবি।
খসড়া আইনে দেশের সব নদীকে ‘আইনি ব্যক্তি’, ‘আইনি সত্তা’ এবং ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে বিশেষ আইনগত মর্যাদা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশের সব নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলকে ‘পাবলিক ট্রাস্ট প্রপার্টি’ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এতে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা শিল্পকারখানা নদী, খাল ও সমুদ্র উপকূলের তীরভূমি ও ফোরশোরে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করলে সংশ্লিষ্টদের ৫ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। দূষণ এবং অবৈধভাবে বালু ও পাথর তুললেও জড়িতদের বিরুদ্ধে একই সাজা প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এই সাজা দেওয়ার জন্য স্থাপন করা হবে ‘নদী আদালত’। তবে নদী আদালত স্থাপন না হওয়া পর্যন্ত প্রচলিত আদালতে বিচার চলবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এই আইন কার্যকর হলে পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষসহ (বিআইডব্লিউটিএ) সরকারের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এখতিয়ার কমে যাবে। বিশেষত সারা দেশের পরিবেশ দূষণসংক্রান্ত সব কার্যক্রম পরিচালনা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এই সংশোধনী পাশ হলে নদীসংক্রান্ত পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব পাবে নদী রক্ষা কমিশন, এতে পরিবেশ অধিদপ্তরের এখতিয়ার ক্ষুণ্ন হবে।
অপরদিকে নদীকেন্দ্রিক যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএ অনাপত্তি দিয়ে থাকে এবং বন্দর এলাকায় সীমানা দখল হলে অভিযান চালায়। সংশোধনী পাশ হলে বিআইডব্লিউটিএর এখতিয়ারও কমে যাবে। ইতোমধ্যে বিআইডব্লিউটিএ চিঠি দিয়ে তাদের আপত্তির কথা নৌ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে। একইভাবে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কার্যপরিধি কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
আইন সংশোধনের বিষয়ে নদী রক্ষা কমিশনের সচিব মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার জানান, এ সংশোধনী পাশ হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমের কিছু অংশ নদী রক্ষা কমিশনের কাছে আসবে, তবে বাকি অন্য কর্তৃপক্ষগুলোর কার্যক্রমে তেমন প্রভাব পড়বে না।
সংশোধনীর যৌক্তিকতা তুলে ধরে মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার আরও বলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করতে এই সংশোধনী আনা হয়েছে। পরিবেশ আদালতের মতো পৃথক নদী আদালত প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে এবং মোবাইল কোর্টকে অভিযান চালানোর ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, এ আইনের সংশোধনী পাশ হলে তা নদী-খাল রক্ষায় দারুণ সহায়ক হবে বলে মনে করেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী। ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এর ফলে নদী রক্ষা কমিশন স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে এবং যেসব জায়গায় নদী দখল ও নদীর অপব্যবহার হচ্ছে, সেসব জায়গায় সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ড. মনজুর আহমেদ চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, বিএনপি সরকার খাল খনন কর্মসূচি নিয়েছে, যা একটি ভালো উদ্যোগ। এটি যেন সঠিকভাবে ও ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হয় সেদিকে সরকারকে মনোযোগী হতে হবে।
সূত্র জানায়, নদী রক্ষা কমিশন আইনের সংশোধনীর ওপর আগামী ১৬ এপ্রিলের মধ্যে মতামত দিতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে পাঠানো হয়েছে। সাধারণ মানুষও নৌসচিবের দপ্তরে মেইল করে মতামত দিতে পারবেন। বিদ্যমান আইনে ২১টি ধারা থাকলেও সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ৩৮টি করা হয়েছে। সংশোধনীতে নদীর পাশাপাশি খাল ও সমুদ্র উপকূলের দখল-দূষণ বন্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারবে কমিশন। এমনকি একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একই অপরাধ একাধিকবার করলে তার দণ্ড দ্বিগুণ হবে।
বিগত সরকারের সময়ে দখল-দূষণ নিয়ে নৌপরিবহণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দূরত্বের কারণে এক চেয়ারম্যানকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া হলেও নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়া অপসারণ করা যাবে না বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
