
চট্টগ্রামে হঠাৎ করেই হাম ও নিউমোনিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। গত ১০ দিনে নগরীর বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে অন্তত চার শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যুর কোনো তথ্য এখনো তাদের দপ্তরে নথিভুক্ত নেই এবং সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে।
হাসপাতালগুলোর সূত্রমতে, রোববার পর্যন্ত নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে অন্তত ২৪ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ছয়জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে গত ১০ দিনে আইসিইউতে হামের জটিলতা নিয়ে ১৫ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এ বিষয়ে হাসপাতালটির শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিশু তালুকদার জানান, আক্রান্ত শিশুদের উচ্চ জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং খিঁচুনির মতো মারাত্মক উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে তাঁদের আইসিইউতে ভর্তি করে আইসোলেশনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। দুর্ভাগ্যবশত কিছু রোগীর অবস্থা খুব দ্রুত অবনতি হচ্ছে এবং সেখানে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে ও ছয়জন এখনো সংকটাপন্ন বলে ডা. মিশু তালুকদার নিশ্চিত করেন।
এদিকে, চট্টগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (সিআইএমসিএইচ) এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কলেজটির অধ্যক্ষ ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সেখানে আরও দুজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ডা. মুসলিম উদ্দিন সবুজ আরও বলেন, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। সংক্রমণ থেকে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে মায়েদের পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) রোববার হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ১২ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল, যাদের বেশিরভাগই কক্সবাজার জেলা থেকে এসেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চমেক কর্তৃপক্ষ তাদের ডেঙ্গু কর্নারটিকে ‘হাম কর্নার’-এ রূপান্তরিত করেছে। চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া জানান, তাৎক্ষণিক শনাক্তকরণের জন্য বাহ্যিক উপসর্গ ব্যবহার করা হলেও, আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এছাড়া চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে বোয়ালখালী ও হাটহাজারী উপজেলা থেকে আসা দুজন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস (বিআইটিআইডি)-এর অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ জানিয়েছেন, হাম সাধারণত নিরাময়যোগ্য হলেও সংকটাপন্ন রোগীদের পুরোপুরি সুস্থতার জন্য দ্রুত চিকিৎসকের হস্তক্ষেপ জরুরি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিআইটিআইডিতে ছয় শয্যার একটি আইসোলেশন ব্লক প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে অধ্যাপক ডা. মামুনুর রশীদ জানান।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বক্তব্য ও প্রস্তুতি
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম আশ্বস্ত করেছেন যে, জেলায় হামের টিকার কোনো সংকট নেই এবং নিয়মিত সময়সূচি অনুযায়ী টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। তবে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের রোববারের (২৯ মার্চ) সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাত ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ২ জন, চমেক হাসপাতালে ১১ জন এবং মা ও শিশু হাসপাতালে ৪ জন রোগী সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এসব রোগীর নমুনা পরীক্ষার কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন।
সিভিল সার্জন কার্যালয় আরও জানায়, নগরী ও আশপাশের এলাকায় শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়াজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এসব রোগীর চিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হাম প্রতিরোধে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শিশু জন্মের ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়। তবে ৯ মাসের কম বয়সি শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
হাম শনাক্ত করতে বাহ্যিক লক্ষণ হিসেবে গালের ভেতরের অংশে সাদা বা ধূসর দানা বা কপলিক স্পট দেখা দেয়। এছাড়া কান বা মুখমণ্ডল থেকে শুরু হয়ে শরীরের নিচের দিকে ছড়িয়ে পড়া লালচে দাগ এবং তীব্র জ্বর, অনবরত কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গগুলো পর্যবেক্ষণ করা হয়। জরুরি বিপদচিহ্ন হিসেবে শ্বাসকষ্ট, শিশু নিস্তেজ হয়ে পড়া, খিঁচুনি হওয়া এবং একদম খেতে না পারা বা বমি করার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি এবং পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আক্রান্ত শিশুদের অন্য শিশুদের কাছ থেকে আলাদা রাখা, প্রচুর পানি ও তরল খাবার দেওয়া এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন-এ নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
