
বিদ্যুৎ, নেটওয়ার্ক ও রাস্তাঘাটসহ নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এক দুর্গম জনপদের নাম কালাপানি। মিরসরাই উপজেলার করেরহাট ও ফটিকছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এই পাহাড়ি এলাকায় সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই নেমে আসে ভৌতিক অন্ধকার। আশপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে কোনো টাওয়ার না থাকায় তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগেও মোবাইল নেটওয়ার্কের সুবিধা থেকে বঞ্চিত এই জনপদের ত্রিপুরা ও বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধসহস্রাধিক মানুষ। যাতায়াতব্যবস্থায়ও উন্নয়নের ছোঁয়া না লাগায় পাহাড়ি পথে জীবন-জীবিকার তাগিদে যাতায়াতে তাঁদের অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার করতে হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্গম পাহাড়ি পথ ও অধিক দূরত্বের কারণে কালাপানির খুব কমসংখ্যক শিশুই দূরের শিক্ষালয়ে গিয়ে শিক্ষা লাভের সুযোগ পেত। এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের কথা চিন্তা করে ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে স্থানীয় করেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন নয়ন ‘কালাপানি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।
প্রথম শ্রেণি দিয়ে শুরু হওয়া বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৩০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীদের বইয়ের পাশাপাশি তিনজন শিক্ষকের বেতনও ব্যক্তিগতভাবে বহন করতেন এনায়েত হোসেন নয়ন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর এনায়েত হোসেন নয়ন এলাকা ছেড়ে চলে গেলে চরম অর্থসংকটে পড়ে বিদ্যালয়টি।
বিদ্যালয়টির দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী বিজলী ত্রিপুরার বড় ভাই রিপন ত্রিপুরা জানান, পাড়ার মধ্যে বিদ্যালয়টি থাকায় এখানকার শিক্ষার্থীরা অনেক উপকৃত হয়েছিল। কালাপানি থেকে মিরসরাইয়ের করেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৮ কিলোমিটার। এত দূরে গিয়ে কোমলমতি শিশুদের পক্ষে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব। বই ও অর্থসংকটে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিজলী ত্রিপুরাসহ ১৩০ জন শিক্ষার্থী চরম বিপাকে পড়েছে বলে রিপন ত্রিপুরা আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
কালাপানি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিজয় ত্রিপুরা এ বিষয়ে বলেন, বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষকেরা বাধ্য হয়ে অন্য জায়গায় চাকরি নিয়েছেন। গত বছর পুরোনো বই দিয়ে কোনোমতে পাঠদান কার্যক্রম চালানো হলেও চলতি বছর তা আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই বিদ্যালয়টি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রধান শিক্ষক বিজয় ত্রিপুরা বিদ্যালয়টি রক্ষায় বর্তমান সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি গোবিন্দ ত্রিপুরা বলেন, অর্থ, শিক্ষক ও শিক্ষাসামগ্রীসহ বিভিন্ন সংকট থাকার পরও বিদ্যালয়টি এত দিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছিল। কিন্তু চলতি বছর সরকারি বই না পাওয়ায় অবশেষে তাঁরা বিদ্যালয়টি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে গোবিন্দ ত্রিপুরা জানান।
তবে মিরসরাই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম ফজলুল হক জানান, কালাপানি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধের বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একেএম ফজলুল হক আরও বলেন, তাঁর কাছে যে কয়টি বিদ্যালয়ের বইয়ের চাহিদাপত্র এসেছে, নিয়ম অনুযায়ী সব কটিতেই বই দেওয়া হয়েছে।
