
টানা সংগ্রাম ও অভাবনীয় সাফল্যের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর এবার নিজেদের ঘরের দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দলটির শীর্ষ নেতারা যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন সাংগঠনিক কার্যক্রমে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ভাটা পড়েছে। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও আগের মতো নেতাকর্মীদের নিত্য আনাগোনা নেই। এমন বাস্তবতায় দলকে নতুন করে চাঙা করতে পুনর্গঠনের বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকেও দ্রুত ঢেলে সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। জানা গেছে, চলতি বছরই দলের জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
দলের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল হলেই চলবে না; রাজপথে বিরোধী দলকে শক্তভাবে ও রাজনৈতিক উপায়ে মোকাবিলা করতে হলে একটি সুসংগঠিত দলীয় কাঠামো অপরিহার্য। ঈদের আগে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলতি বছরেই জাতীয় কাউন্সিলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন। দল ও সরকারের একাকার হয়ে যাওয়ার প্রশ্নে তিনি জানান, সরকার গঠনের কারণে দলের বেশিরভাগ নেতা রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত হওয়ায় শূন্যস্থানগুলো পূরণে কিছুটা সময় লাগছে। তবে সরকার তার নিজ গতিতে কাজ করবে, এবং দলও তার সাংগঠনিক গতি ফিরে পাবে।
আসন্ন কাউন্সিলে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে দলের মহাসচিব পদটি। বর্তমানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল কর্মযজ্ঞের দায়িত্বে থাকায় দলে সার্বক্ষণিক সময় দেওয়া তাঁর জন্য বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন মহাসচিব হিসেবে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নাম জোরেশোরে শোনা যাচ্ছে। এছাড়া জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও এই পদের দৌড়ে রয়েছেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সরকারের পাশাপাশি দলকে শক্তিশালী করার এই উদ্যোগে সরাসরি নজর রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সাথে এক বিশেষ বৈঠকে তিনি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরুর নির্দেশ দেন। দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বেলায়েত হোসেন মৃধাকে বিশেষ সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যায় নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সাথে বৈঠক করেন তারেক রহমান, যেখানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত ছিলেন। সরকারের বাইরে থাকা ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের দিয়ে দলের হাল ধরার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানিয়েছেন, সরকার গঠনের পর তারা মূলত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নিরলস কাজ করছেন। সরকারি ব্যস্ততার কারণে নেতারা নিয়মিত কার্যালয়ে যেতে না পারলেও নিজ নিজ এলাকায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। দলের পুনর্গঠনকে একটি রুটিন ওয়ার্ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাউন্সিল অনুষ্ঠানের বিষয়টি দলীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান ঠিক করবেন।
সরকার পরিচালনার পাশাপাশি সংসদেও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন হয়েছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন এবং আগামীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর নাম বেশ আলোচনায় রয়েছে। মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সংসদীয় স্পিকারের দায়িত্ব নিয়েছেন এবং গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে কার্য উপদেষ্টা কমিটিতে রাখা হয়েছে। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্ত্রিসভায় এবং মির্জা আব্বাস ও নজরুল ইসলাম খান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
মূল দলের পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং কৃষক দলের মতো অঙ্গসংগঠনগুলোতেও বড় পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী এবং কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে এই সংগঠনগুলোর কার্যক্রমে যেন স্থবিরতা না আসে, সেজন্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সংরক্ষিত নারী আসনেও দলের ত্যাগী নেত্রীরা দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দিকে তাকিয়ে আছেন।
বিএনপির নীতিনির্ধারকরা স্পষ্ট করেছেন যে, বিগত সরকার বিরোধী দলকে দমন করতে যেভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অপব্যবহার করেছিল, বিএনপি সেই পথে হাঁটবে না। বর্তমান প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে তারা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবেই মোকাবিলা করতে চায়। তাই দলের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির দীর্ঘ ৪১ বছরের কাণ্ডারি দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার গত ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুর পর দলের হাল শক্ত হাতে ধরেছেন তারেক রহমান। তাঁর বিচক্ষণ নেতৃত্বেই বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করেছে। সামনেই দেশজুড়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো যেন কোনো সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগ নিতে না পারে, সেজন্য তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে নতুন করে সাজানোই এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
