
দেশে হামের টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ব্যত্যয় এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে রোগটির প্রাদুর্ভাব চরম আকার ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুই টিকার বাইরে রয়ে গেছে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর ফলে দেশের বিভিন্ন জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে মার্চ মাসে অন্তত ৫৬ জন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে হামের টিকাদান কভারেজ ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। করোনা মহামারির সময়েও টিকাদানের হার এর চেয়ে বেশি ছিল। কভারেজ কমার তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ইপিআইয়ের ওয়েবসাইট থেকে কিছু তথ্য সরিয়ে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক ইপিআই ব্যবস্থাপক ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান জানান, স্বাস্থ্য সহকারীদের তিন দফায় কর্মবিরতি টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক স্বাস্থ্য সহকারীর চাকরি চলে যায়। সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হলেও দেশের অধিকাংশ এলাকায় পদ শূন্য থাকায় এবং টিকা পরিবহন ব্যবস্থাপনায় জটিলতার কারণে টিকাদান কভারেজ কমেছে।
এছাড়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া এবং ২০২০ সালের পর আর কোনো বড় আকারের হাম-রুবেলা (এমআর) ক্যাম্পেইন না হওয়া পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ মনে করেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব এবং স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের জটিলতাই এই সংকটের অন্যতম কারণ।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে টিকা কেনায় ব্যাপক বিলম্ব হয়েছে। সরকার সরাসরি টিকা কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় কয়েক মাস সময় নষ্ট হয়। সাবেক স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমান এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নানা আপত্তিতে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হয়। সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এবং ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তাদের সাড়া মেলেনি। তবে মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ পরবর্তীতে গণমাধ্যমকে জানান, ক্যাম্পেইনের জন্য টিকা থাকলেও গ্যাভির আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় সিরিঞ্জ কেনায় বিলম্ব হচ্ছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহ জেলায় হাম বেশি ছড়িয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে সেখানে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন, যাদের ৬৫ শতাংশের বয়স ছয় মাসের নিচে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, পরিস্থিতি বিবেচনায় টিকার বয়সসীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, আইসিইউ সংকট কাটাতে রাজশাহী শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মার্চ মাসেই ২৮৬ শিশু ভর্তি হয়েছে এবং মারা গেছে চারজন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং সাতজনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গোপালগঞ্জে এক শিশুর মৃত্যুর পর আরও ছয় শিশু চিকিৎসাধীন। শরীয়তপুরে গত ৯ দিনে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন জানান, জনস্বাস্থ্যবিদদের সতর্কবার্তা আমলে না নেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দ্রুত টিকা প্রদান, নতুন রোগী খুঁজে বের করা এবং কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। টিকাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের (নাইট্যাগ) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
