৫৬টি শিশুর মৃত্যুর দায়ভার আসলে কে নেবে?


আজ পহেলা এপ্রিল, ২০২৬। বাতাসে আজ বসন্তের সজীবতার বদলে কেবলই সন্তানহারা মায়েদের গগনবিদারী আর্তনাদ ভাসছে। এই হাহাকার শুধু চট্টগ্রামের নয়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল থেকে শুরু করে গোটা বাংলাদেশের আকাশ আজ ভারী হয়ে উঠেছে। গত মার্চ মাসে দেশে হামের সংক্রমণে ৫৬ জন নিষ্পাপ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যে বয়সে এই শিশুদের হাসিখুশিতে পুরো বাড়ি মেতে থাকার কথা, সেই বয়সে তারা হাসপাতালের বিছানায় ধুঁকে ধুঁকে প্রাণ হারিয়েছে। হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। যে বাংলাদেশ একসময় নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে পোলিও ও ধনুষ্টংকার নির্মূল করে বিশ্বদরবারে প্রশংসা কুড়িয়েছিল, সেই দেশেই আজ টিকার অভাবে শিশুরা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। স্বাস্থ্য খাতকে রাজনৈতিকীকরণ করা এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের চরম প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে আজ এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ও ক্ষোভের বিষয় হলো, এই পাহাড়সম ব্যর্থতার পর সংশ্লিষ্টরা কীভাবে নিজেদের দায় এড়াবেন, সেই ছক তারা ইতিমধ্যেই কষতে শুরু করেছেন। বিগত সরকারের সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত যারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে আসীন ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে নিজেদের গাফিলতি ঢাকার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআইয়ের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে হামের টিকাদান কভারেজ ছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৫ সালে অবিশ্বাস্যভাবে মাত্র ৫৬ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুই টিকার বাইরে রয়ে গেছে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি—এই ছয় টিকার মজুত শূন্য। এই তথ্যের দায়ভার কে নেবে? তারা কীভাবে এই অবহেলার জবাব দেবেন?

সাবেক ইপিআই ব্যবস্থাপক ডা. আবুল ফজল মো. শাহাবুদ্দিন খান অত্যন্ত সহজভাবে দায় চাপিয়েছেন মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর। তিনি জানিয়েছেন যে, স্বাস্থ্য সহকারীদের তিন দফায় কর্মবিরতি টিকাদান কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, টিকাদান কেন্দ্রে টিকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা পোর্টাররা কেন টানা নয় মাস ধরে বেতন পাবেন না? এই চরম অমানবিকতার জন্য কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দায়ী নন? সীমিত সংখ্যক কর্মী নিয়োগ এবং দেশের অধিকাংশ এলাকায় পদ শূন্য থাকার দায় কি শুধুই মাঠপর্যায়ের?

দায় এড়ানোর আরেক চমৎকার কৌশল হলো ‘নীতিগত সিদ্ধান্ত’ ও ‘অর্থায়ন জটিলতা’র দোহাই দেওয়া। বিশ্বব্যাংকের সাবেক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজীর আহমেদ এই সংকটের পেছনে নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রভাব এবং স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়নের জটিলতাকে দায়ী করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এইচপিএনএসপি তথা ওপি–ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সরকার সরাসরি টিকা কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে, সেই সিদ্ধান্তহীনতায় পার হয়ে যায় মহামূল্যবান কয়েক মাস সময়। তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমান বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের নানা আপত্তির অজুহাতে পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করা হয়। যখন আমলারা ফাইলের পর ফাইল চালাচালি করছিলেন, তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিশুরা হামে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে। এই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার আড়ালে যে চরম গাফিলতি লুকিয়ে আছে, তা কি আদৌ ক্ষমাযোগ্য?

দায়িত্বপ্রাপ্তরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার বদলে নীরবতা পালন করে কীভাবে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন, তা দেখলে শিউরে উঠতে হয়। সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান এই বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে স্পষ্ট কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাদের এই নীরবতা কি শিশুদের মৃত্যুর প্রতি তাদের চরম উদাসীনতার প্রমাণ নয়? অন্যদিকে, বর্তমান দায়িত্বশীলদের অবস্থা আরও করুণ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক হালিমুর রশিদ এবং ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস এই বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলছেন না। যখন দেশের শিশুরা মারা যাচ্ছে, তখন শীর্ষ কর্তাদের এই লুকোচুরি খেলা প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে ব্যস্ত। পরবর্তীতে ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ গণমাধ্যমকে জানান যে, ক্যাম্পেইনের জন্য টিকা থাকলেও গ্যাভির আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় নাকি সিরিঞ্জ কেনায় বিলম্ব হচ্ছে! একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে শিশুদের জীবন রক্ষাকারী টিকার সিরিঞ্জ কেনার জন্য বিদেশি সহায়তার অপেক্ষায় বসে থাকার মতো খোঁড়া যুক্তি দিয়ে তারা মূলত নিজেদের অযোগ্যতাকেই আড়াল করছেন।

এদিকে জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে গেলে গাফিলতির আসল চিত্র চোখে পড়ে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যুর পর বর্তমানে সেখানে ৯৮ শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় টিকার বয়সসীমা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী আইসিইউ সংকট কাটাতে রাজশাহী শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো এত দেরিতে কেন? চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে মার্চ মাসেই ২৮৬ শিশু ভর্তি হয়েছে এবং চারজন মারা গেছে। চট্টগ্রামেও হামের লক্ষণ নিয়ে অন্তত চার শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরেও শিশুরা মারা যাচ্ছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন যে, জনস্বাস্থ্যবিদদের সতর্কবার্তা আমলে না নেওয়ায় আজ এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তিনি দ্রুত টিকা প্রদান এবং নতুন রোগী খুঁজে বের করার ওপর জোর দিলেও, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেবল আগামী জুনের মধ্যে ক্যাম্পেইন করার পরিকল্পনার কথা বলেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ মনে করছে।

এই ৫৬ জন শিশুর মৃত্যু কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এগুলো ৫৬টি সম্ভাবনার অপমৃত্যু, ৫৬টি পরিবারের আজীবনের কান্না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চরম গাফিলতি, সিদ্ধান্তহীনতা এবং একে অপরের ওপর দায় চাপানোর নোংরা রাজনীতির বলি হয়েছে এই শিশুরা। যারা শিশুদের জীবনের চেয়ে নিজেদের পদ, প্রটোকল এবং ফাইলের মারপ্যাঁচকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, তাদের কাউকেই এই হত্যার দায় থেকে রেহাই দেওয়া উচিত নয়। দায় এড়ানোর এই নির্লজ্জ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিটি মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা না গেলে, আমাদের স্বাস্থ্য খাত এক বিশাল মৃত্যুউপত্যকায় পরিণত হবে। শিশুদের রক্তের দাগ কোনো অজুহাতেই মুছে ফেলা যাবে না।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।