
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে অন্তর্বর্তী সরকার যেসব অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সেগুলো আইনে রূপান্তরে সংসদকে সুপারিশ করেছে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। অন্যদিকে যেসব অধ্যাদেশে সরকারের জবাবদিহি বাড়ানো হয়েছিল, সেগুলো রহিত কিংবা এখনই সংসদে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বেশ কিছু সুপারিশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে সরকারি দল বিএনপি বিনা বাধায় সংসদে সুপারিশটি কার্যকর করতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে সরকারের ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিন গত ১৩ মার্চ উত্থাপন করা হয়। সেদিন গঠিত ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে। বৃহস্পতিবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদের বৈঠকে বিশেষ কমিটির সভাপতি জয়নুল আবেদীন সুপারিশ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। প্রতিবেদনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ৯৮টি অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করতে বিল আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে বিল আকারে উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে এবং ২০টি অধ্যাদেশ আপাতত আর আইনে রূপান্তর হচ্ছে না।
মন্ত্রণালয়ের মতামত উপেক্ষা ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বহাল
যেসব অধ্যাদেশ বিল আকারে উত্থাপন তথা আইনে রূপান্তর করার সুপারিশ করা হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ ও প্রশাসক নিয়োগ, আন্দোলন করলে সরকারি কর্মচারীদের ২৮ কার্যদিবসের মধ্যে বরখাস্ত করা এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে কারণ দর্শানো ছাড়াই ওয়াসার কর্মচারীদের অপসারণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখা। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এসব ক্ষেত্রে ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের শঙ্কা প্রকাশ করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।
বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বহাল থাকছে। সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পরামর্শে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক বিচারপতি নিয়োগের কথা বলা হলেও, পরোক্ষভাবে তা প্রধানমন্ত্রীর পছন্দেই হয়ে থাকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিলের হাতে দেওয়ার অধ্যাদেশ জারি করলেও তা আইনে রূপান্তর হচ্ছে না। একইসঙ্গে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশও বাতিল হচ্ছে।
আইনজীবী ড. শাহ্দীন মালিক এ বিষয়ে জানান, এসব অধ্যাদেশ বাতিল বা নতুন করে আইন করতে গিয়ে যদি সরকার মাসের পর মাস সময় অতিবাহিত করে, তবে বুঝতে হবে এই সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চায় না। বিচার বিভাগ স্বাধীন না হলে দেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কেবল বুলিতে পরিণত হবে।
জবাবদিহির অধ্যাদেশ বাতিল ও গুম প্রতিরোধ আইন
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশও আইনে রূপান্তর করা হচ্ছে না। জাতীয় নিরাপত্তার কারণে আটককে গুমের সংজ্ঞা থেকে বাদ দেওয়া এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তে সরকারের পূর্বানুমতি নেওয়ার বিষয়ে সরকারের আপত্তির কারণেই এই সুপারিশ করা হয়েছে।
বিশেষ কমিটির বিরোধীদলীয় সদস্য রফিকুল ইসলাম খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজেই একজন গুমের শিকার ব্যক্তি। তিনি গুমের কারণে নিপীড়িত হয়েছেন। কিন্তু তাঁর মন্ত্রণালয় থেকে যে মতামত এসেছে, তা খুবই দুঃখজনক। সরকারি দল অধ্যাদেশটিকে সংসদে উপস্থাপনই করছে না, এতে গুমের সংস্কৃতি ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি, দুদকের স্বাধীন সার্চ কমিটি গঠন এবং তথ্য অধিকার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলোও বাতিল বা সংশোধনের সুপারিশ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মুজিবুর রহমান, রফিকুল ইসলাম খান ও জিএম নজরুল ইসলাম কমিটিতে ১৯টি সুপারিশে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন।
মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে মতানৈক্য ও অন্যান্য বাতিল অধ্যাদেশ
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল অধ্যাদেশ পাস করতে যাচ্ছে সরকার। এতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টির নাম রয়েছে। এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী আপত্তি জানিয়ে বলেছে, ২০২২ সালে শেখ হাসিনা এই বিধান করেছিলেন। ২০০২ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের আইনে দলগুলোকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী বলা হয়নি।
সংসদীয় কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, গণভোট, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে। এর মধ্যে ১৬টি এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করায় আগামী ১২ এপ্রিলের পর এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বাকি চারটি সরাসরি রহিতকরণের সুপারিশ করা হয়েছে। অপরদিকে, ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত অবস্থায় এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে পাস করার সুপারিশ করা হয়েছে।
