- সোনাদিয়ার বিস্তীর্ণ প্যারাবনের শত শত বাইনগাছ কেটে এস্ক্যাভেটর লাগিয়ে উজাড় করছে দখলদাররা।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে গোরকঘাটা, কুতুবজোম ও সোনাদিয়া উপদ্বীপের প্রায় ৫ হাজার একর প্যারাবন (ম্যানগ্রোভ বন) দখল করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্থানীয় একাধিক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি উপকূলীয় বন বিভাগের দায়ের করা এক মামলার সূত্রে এই বিশাল বনভূমি দখলের তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
গত ২ এপ্রিল ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে মহেশখালী থানায় মামলাটি দায়ের করেন গোরকঘাটা উপকূলীয় বন বিটের প্রধান কর্মকর্তা ও মহেশখালীর ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা বিভাষ কুমার মালাকার। মামলায় আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, আগের মতো এবারও প্রকৃত প্রভাবশালী ‘রাঘববোয়ালদের’ নাম গোপন রেখে মামলাটি সাজানো হয়েছে। এর আগে ১ মার্চ সোনাদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্যারাবন কাটার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে চকরিয়া উপজেলার দুলহালিয়া পাড়ার আবদুল মান্নানের ছেলে মুবিনুল ইসলাম ও একই উপজেলার চরপাড়ার বাসিন্দা মুরুফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে প্রশাসন।
দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালীকে শত শত বছর ধরে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করছে এই প্যারাবন। বন বিভাগের দাবি, ৫ হাজার একর বনভূমির বিশাল এই অংশটি কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান ও যুবলীগ নেতা অ্যাডভোকেট শেখ কামাল, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আনোয়ার পাশা চৌধুরীর দুই ছেলে মোস্তফা আনোয়ার চৌধুরী ও মহসিন আনোয়ার চৌধুরী, উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক সাজেদুল করিম, আওয়ামী লীগ নেতা ডা. আমিরুজ্জামান আনজু, কুতুবজোম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রবি আলম, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল আমিন খোকা, ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ রফিক, মহেশখালী পৌর যুবদল নেতা ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর ছিদ্দিক, সাবেক পৌর মেয়র মকছুদ মিয়ার সৎছোট ভাই কাইছার সিকদার, কুতুবজোম ইউনিয়ন জামায়াতের সহসভাপতি নাজিম উদ্দিন এবং উপজেলা জামায়াতের সিনিয়র নেতা সৈয়দুল হক সিকদারসহ ৩০ জনের দখলে রয়েছে।
মামলার অন্য আসামিরা হলেন—ছাত্রলীগ নেতা মো. শমসের (৩৫), সোনাদিয়া ইউপি সদস্য একরামুল হক (৪০), কালু মিয়া (৪০), মোহাম্মদ শাহেদ (৩০), ওসমান আলী, জসিম উদ্দিন (৩১), মোহাম্মদ আমিন (৫০), ইমতিয়াজ উদ্দিন নাকিব (৩২), যুবলীগ নেতা নজরুল ইসলাম (৩২), সাজ্জাদ (৪০), নাজিম উদ্দিন (৪৫), জয়নাল আবেদীন (৫০), শামসুল আলম (৫০), আবদুর রহিম (৪২), যুবলীগ নেতা আব্বাস মিয়া (৪৮), আজিজুল হক (৪৩), নুরুল আজিম (৪২) ও মোহাম্মদ রফিক (৫৫)।
সূত্র জানায়, দখলদাররা এস্ক্যাভেটর দিয়ে হাজার হাজার প্রাকৃতিক বাইন, কেওড়া ও কেয়া গাছ কেটে রাতারাতি বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি জমি দখল করে চিংড়িঘের তৈরি করছে। সরকারি জমি দখলের এই মামলায় আসামিদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বন বিভাগের দাবি, আওয়ামী লীগের শাসনামলেও দলটির নেতারা দফায় দফায় প্যারাবন কেটেছেন। এর আগে যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, তাঁদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় দখলদারি থামেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল ঝাপুয়া বন বিট কর্মকর্তা এইচ এম মাহমুদুল হাসান বাদী হয়ে মহেশখালী থানায় শাহাব উদ্দিন নামের এক ব্যক্তিকে প্রধান আসামি করে ১০ জন ও অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। ওই এজাহারে বলা হয়েছিল, ৭২ একর প্যারাবনের ৭২ হাজার বাইনগাছ কেটে চিংড়িঘের নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে বন বিভাগের ক্ষতি হয় ৫ কোটি ৬৫ লাখ ৪৪ হাজার ৪৮০ টাকা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই দশক আগে থেকেই কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘটিভাঙা এলাকায় ‘হাবিব উল্লাহ ঘোনা’ নামে পরিচিত চিংড়িঘেরে কোনো প্যারাবনের অস্তিত্ব ছিল না। ওই এলাকার জমিগুলো মহেশখালী পৌরসভা, বড় মহেশখালী, কুতুবজোম ও ছোট মহেশখালীর বিভিন্ন ব্যক্তির নামে সরকারি বন্দোবস্ত ও লিজের আওতায় রয়েছে। এসব জমিতে দীর্ঘকাল ধরে চিংড়ি ও লবণ চাষ হয়ে আসছে, যেখানে চাষিরা নিয়মিতভাবে বার্ষিক বর্গা ও খাজনা পরিশোধ করে ভোগদখল করছেন।
তবে পরিবহন শ্রমিক নেতা হাবিব উল্লাহ হাবিবের নাম নতুন এই মামলায় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় একটি মহল বিষয়টিকে কেন্দ্র করে তাঁকে টার্গেট করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হাবিব উল্লাহ দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে তাঁকে এই মামলার সঙ্গে জড়ানোর চেষ্টা চলছে, যাতে সরকারি অভিযানের প্রেক্ষাপটকে ভিন্ন খাতে নেওয়া যায়। প্যারাবন দখলে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি লিখেছেন, তিনি কোনো প্যারাবন কাটার সঙ্গে জড়িত নন। ২০ বছর ধরে লিজ নেওয়া জমিতে চিংড়ি চাষ করছেন এবং এর সব প্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মহেশখালীতে গোরকঘাটা রেঞ্জের সাতটি বিটের অধীন ৪২ হাজার ২৯৪ একর প্যারাবন (বনভূমি) রয়েছে। এর মধ্যে বন বিভাগের দখলে আছে ৩৭ হাজার ১৯৮ একর। অবশিষ্ট ৫ হাজার ৯৬ একর বনভূমি গত ১০ বছরে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দখল করেছেন। এতে লাখেরও বেশি বাইন ও কেওড়াগাছ কাটা পড়েছে। রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়েই মূলত দখলদাররা এই নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।
এর আগে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন সোনাদিয়া দ্বীপের প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘের নির্মাণ ও আগুনে গাছপালা ধ্বংসের অভিযোগে স্থানীয় বিএনপি নেতা আলমগীর চৌধুরীকে প্রধান আসামি করে ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০২৫ সালের ১৮ মে মহেশখালী থানায় মামলাটি দায়ের করেছিলেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের সিনিয়র কেমিস্ট মো. আবদুছ ছালাম। আসামিদের অধিকাংশই ছিলেন বিএনপি ও নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মী।
স্থানীয় সাংবাদিক আজিজ সিকদার জানান, মহেশখালীতে প্যারাবন ধ্বংসের ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও একাধিক মামলা হলেও দৃশ্যমান কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তাঁর দাবি, প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও প্রকৃত প্রভাবশালী দখলদারদের নাম এড়িয়ে সাধারণ মানুষকে আসামি করা হয় বেশি। এমন অভিযোগও রয়েছে, বাস্তবে বন কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন অনেককেও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশবিদদের মতে, ম্যানগ্রোভ প্যারাবন উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এই বন ঢাল হিসেবে কাজ করে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনে। কিন্তু নির্বিচারে বন উজাড়ের ফলে এই সুরক্ষা বলয় ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে উপকূলের মানুষের জীবিকা ও নিরাপত্তা অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে উপকূলীয় বন বিভাগের কক্সবাজারে কর্মরত সহকারী বন সংরক্ষক আবুল কালাম আজাদ জানান, তাঁরা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করে মামলা করেননি, বরং প্যারাবন কাটায় যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাঁদের বিরুদ্ধেই আইনি অবস্থান নিয়েছেন। আগের মামলাগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁদের কাজ দখলদারদের চিহ্নিত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া; গ্রেপ্তার ও আইন প্রয়োগের দায়িত্ব পুলিশ ও আদালতের। এবারের মামলায় কোনো রাজনৈতিক দল প্রভাব খাটাতে পারেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। দখল হওয়া প্রায় ৫ হাজার একর বনভূমি উদ্ধারে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও যাঁদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সুলতান জানান, গোরকঘাটা, কুতুবজোম ও সোনাদিয়া দ্বীপে প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘের নির্মাণের অভিযোগে উপকূলীয় বন বিভাগ ৩০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে। পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ অনুসারে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব বন বিভাগের। থানায় নিয়মিত মামলা হিসেবে রুজু করার পর পরবর্তী সময়ে এটি তদন্তের জন্য উপকূলীয় বন বিভাগের কাছে পাঠানো হবে।

