
ভোরের আলো ফুটতেই প্রতিদিনের মতো বইখাতা হাতে মাদ্রাসার পথ ধরেছিল দুই ছোট্ট শিশু। চোখেমুখে ছিল একরাশ স্বপ্ন আর দুরন্তপনা। কে জানত, সেই চেনা পথই তাদের অনন্তকালের যাত্রাপথ হয়ে দাঁড়াবে! চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ভুজপুরে ইটভাটার জন্য খোঁড়া এক গভীর গর্ত অকালেই কেড়ে নিল দুটি নিষ্পাপ প্রাণ।
রোববার সকালে উপজেলার হারুয়ালছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব-ফটিকছড়ি গ্রামের করিম বাপের বাড়ির পাশে ঘটে যায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনা। চিরতরে না ফেরার দেশে পাড়ি জমানো দুই শিশু হলো ওই বাড়ির হাবিবুর রহমানের নয় বছর বয়সী আদরের কন্যা সাকি আকতার এবং জাকির হোসেনের আট বছর বয়সী স্নেহের কন্যা সানজিদা আকতার। তারা দুজনেই ভুজপুর আল মাহাদুল ইসলাম বালক-বালিকা মাদ্রাসার নূরানী বিভাগের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
জানা যায়, মাদ্রাসা থেকে ফেরার পথে খেলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত ইটভাটার জন্য কাটা এক মরণফাঁদ তথা গভীর গর্তে পড়ে যায় সাকি ও সানজিদা। তাদের বাঁচার আকুতি আর হাউমাউ চিৎকারে ছুটে আসেন পথচারীরা। তড়িঘড়ি করে গর্ত থেকে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে তিনি এই দুই অবুঝ শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। মুহূর্তেই হাসিখুশি দুটি পরিবারের আকাশ ভেঙে পড়ে। খবর পেয়ে ভুজপুর থানা পুলিশ এসে তাদের নিথর দেহ উদ্ধার করে।
সরেজমিনে ওই দুই শিশুর বাড়িতে গেলে এক অভাবনীয় শোকের দৃশ্য চোখে পড়ে। সন্তান হারানো পিতা হাবিবুর রহমান এবং জাকির হোসেনের বুকফাটা আর্তনাদ আর মায়েদের বিলাপ যেন চারপাশের বাতাসকেও ভারী করে তুলেছে। যে আঙিনায় কিছুক্ষণ আগেও সাকি আর সানজিদার হাসির শব্দ অনুরণিত হচ্ছিল, সেখানে এখন শুধুই অনন্ত শূন্যতা আর বোবা কান্না। এই শোক সহ্য করার মতো নয়, এই দৃশ্য দেখার মতো নয়।
স্থানীয়দের চোখে একদিকে স্বজন হারানোর জল, অন্যদিকে কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, ইটভাটার মালিকদের অপরিকল্পিত ও খামখেয়ালিভাবে খোঁড়া এসব গর্তই সাকি ও সানজিদার মতো নিষ্পাপ শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণ। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তৈরি করা এসব মৃত্যুফাঁদের দায়ভার কে নেবে, সেই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। রাষ্ট্রের কি সত্যিই কোনো দায় নেই এই অবহেলাজনিত মৃত্যুর?
এ বিষয়ে ভুজপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিপুল চন্দ্র দে জানান, পুলিশ ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে বিনা ময়নাতদন্তে লাশ দাফনের জন্য আকুতি জানানো হয়েছে। তবে এখনো কোনো ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আসেনি; অভিযোগ পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দুটি সতেজ প্রাণের এমন অকাল মৃত্যুতে শুধু ওই পরিবার দুটি নয়, পুরো এলাকা যেন আজ স্তব্ধ। ইটভাটার এই গর্তগুলো শুধু মাটি নয়, যেন গিলে খাচ্ছে একেকটি সুন্দর স্বপ্ন আর সাজানো সংসার।
