
দীঘিনালার ভূইয়াছড়ির পাহাড়ি পথ বেয়ে উপরে উঠতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। খাগড়াছড়ির রুক্ষ পাহাড়ের চূড়ায় থোকায় থোকায় ঝুলছে ভিনদেশি সব মিষ্টি আঙুর! পাহাড়ে সাধারণত জুম চাষ বা প্রচলিত ফলের বাগান দেখেই মানুষ অভ্যস্ত, কিন্তু সেখানে এমন বিদেশি আঙুরের বাগান যেন এক টুকরো ইউরোপের প্রতিচ্ছবি। মেরুং ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. সালাউদ্দিন নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর পরিশ্রমে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল ২০২৩ সালে। ইন্টারনেট ঘেঁটে, বিশেষ করে ইউটিউব ও ফেসবুকের ভিডিও দেখে আঙুর চাষের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন ৪০ বছর বয়সী মো. সালাউদ্দিন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই অনলাইনে মাত্র ১৪০০ টাকা দিয়ে ইউক্রেনের ‘বাইকুনুর’ জাতের দুটি চারা কিনে আনেন তিনি। শখের বশে শুরু করা সেই ছোট্ট উদ্যোগ আজ ১৫ শতক জমির ওপর এক বিশাল বাণিজ্যিক সম্ভাবনার রূপ নিয়েছে। দীঘিনালায় তিনিই প্রথম এবং একমাত্র বিদেশি জাতের আঙুর চাষি।
মো. সালাউদ্দিনের এই স্বপ্নের বাগানে এখন দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৬০ জাতের আঙুর গাছ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন গ্রুপের সাহায্যে তিনি রাশিয়া, ইউক্রেন, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চারা সংগ্রহ করেছেন। তার বাগানে গেলে দেখা মিলবে ইউক্রেনের ‘বাইকুনুর’, ‘দোভস্কি পিং’, ‘ভাইকিংস টু’, ‘গ্লুরি’, ‘ডিক্সন’, ‘দাসোনিয়া’, ‘নিউরো ব্ল্যাক’, চীনের ‘চ্যাং ফিঙ্গার’ এবং মালয়েশিয়ার ‘গ্রীন লং’-এর মতো বিখ্যাত সব জাত। বাদ যায়নি ‘সিসিলি’, ‘রেড গ্লোব’, ‘আইসবার্গ’, ‘আর্লি রেড’, ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’, ‘এলব্রোস’ ও ‘রেড রোজ’-এর মতো আন্তর্জাতিক জাতগুলোও।

মো. সালাউদ্দিন আশা করছেন, চলতি বছর তার এই বাগান থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি আঙুর উৎপাদিত হবে। তবে তার আয়ের মূল উৎস শুধু ফল বিক্রি নয়। তিনি গ্রাফটিং ও রুট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে অনলাইনে সারা দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে তিনি প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার চারা বিক্রি করেন, যার প্রতিটির মূল্য ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। এখন পর্যন্ত বাগানটি গড়ে তুলতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ২ লাখ টাকা। সঠিক পদ্ধতি ও কেবল জৈব সার ব্যবহার করেই যে এমন সাফল্য পাওয়া সম্ভব, তা তিনি প্রমাণ করে ছেড়েছেন।
এই অভিনব বাগান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন দর্শনার্থীরা। বাগানের সৌন্দর্য ও ফলের স্বাদ নিতে আসা দর্শনার্থী মো. আব্দুল্লাহ খান তার মুগ্ধতা প্রকাশ করে জানান, বাংলাদেশে এই প্রথম তিনি কোনো আঙুর ফলের বাগান দেখলেন। বিদেশি জাতের এই আঙুরগুলো খেতে অত্যন্ত মিষ্টি। পাহাড়ের চূড়ায় সালাউদ্দিন ভাইয়ের এই বাগান দেখে তিনি এতটাই মুগ্ধ হয়েছেন যে, ফেরার পথে ইউক্রেনের বাইকুনুর জাতের দুটি চারাও কিনে নিয়েছেন।
মো. সালাউদ্দিনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নজর কেড়েছে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেরও। দীঘিনালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাদাত হোসেন জানান, মো. সালাউদ্দিন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে এই আঙুর বাগান গড়ে তুলে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। কৃষি অফিস থেকে তার বাগানটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখার পাশাপাশি সব ধরনের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পাহাড়ের মাটিতে আঙুর চাষের এই অপার সম্ভাবনাকে আরও সম্প্রসারিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি, যাতে করে এই অঞ্চলের আরও অনেক কৃষক অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
তবে পাহাড়ের চূড়ায় হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র সংকটে পড়তে হয় সালাউদ্দিনকে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পেলে এই পানির অভাব দূর করে বাগানটিকে বাণিজ্যিকভাবে আরও বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তার এই জীবনসংগ্রাম ও উদ্যোগ প্রমাণ করে, ইচ্ছা আর ধৈর্য থাকলে পাহাড়ের চুড়াতেও স্বপ্নের বীজ বুনে সফলতার মিষ্টি ফসল ঘরে তোলা যায়।
