
সুপ্রিম কোর্টের জন্য স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে এই রায়ে অধস্তন আদালতের বিচারকদের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাবিধানের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন।
রায়ে সরকারকে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃপক্ষের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি স্বাধীন ও পৃথক সচিবালয় আদেশের তারিখ হতে তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রিটের পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, এই রায়ের ফলে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে, রাষ্ট্রপতির ওপর নয়। আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ে পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।
রায়ে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলাসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করেছেন হাইকোর্ট। ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৩৯ ধারা অনুসারে ১১৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাই এটি বাতিল করা হলো। একইভাবে ১৯৭৫ সালের চতুর্থ সংশোধনী আইনের ১৯ ধারার মাধ্যমে ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনও সাংঘর্ষিক বলে বাতিল করা হয়েছে।
সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী ও ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়ের নজির অনুসারে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ যেভাবে ছিল, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত ও সংবিধানে পুনর্বহাল হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। হাইকোর্টের এই রায়ের দিন থেকেই এটি কার্যকর হবে। ১৯৭২ সালের মূল সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচার বিভাগে দায়িত্ব পালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ, কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি দান, ছুটি মঞ্জুরিসহ শৃঙ্খলাবিধান সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত থাকবে। অথচ বিদ্যমান সংবিধানে এটি রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত ছিল এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি তা প্রয়োগ করতেন।
এ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারকদের জন্য করা ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালাকেও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে বাতিল করেছেন হাইকোর্ট।
এর আগে বিদ্যমান সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ এবং ২০১৭ সালের জুডিশিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে এবং বিচার বিভাগীয় পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেনসহ সাতজন আইনজীবী একটি রিট করেন। ওই বছরের ২৭ অক্টোবর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। রুলে আইন মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে জবাব দিতে বলা হয়। এরপর রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের (২০২৫ সালের) ২ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়ে সংক্ষিপ্ত রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট বেঞ্চ। আজ সেই রায়েরই পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হলো।
