যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি: ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য নাকি চরম কৌশলগত পরাজয়?


ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রথম দেখায় এটিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কূটনৈতিক সাফল্য মনে হলেও ভেতরের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। চুক্তির শর্ত, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিশ্বমঞ্চে মার্কিন ভাবমূর্তির অবনতির হিসাব মেলালে স্পষ্ট হয়ে যায়, এই যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বুধবার রাত ৮টার মধ্যে চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানের জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় ব্যাপক হামলার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেই নির্ধারিত সময়সীমার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে তিনি নিজেই পিছু হটে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। চরম হুমকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত এভাবেই পিছিয়ে আসার দৃশ্য বিশ্বের সামনে মার্কিন অবস্থানকে দুর্বল করে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হরমুজ প্রণালি নিয়ে। যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে ইরান প্রণালিটি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দিতে রাজি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে তারা জানিয়ে দিয়েছে, এই জলপথে তাদের ‘কর্তৃত্ব’ এখনো অটুট রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে চলাচল করতে হবে। অর্থাৎ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আগের চেয়ে আরও প্রকাশ্য ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কৌশলগতভাবে একটি বড় ক্ষতি।

এর বাইরে ইরানের দেওয়া ১০ দফা প্রস্তাবে যা চাওয়া হয়েছে, তা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো। এই প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, ইরানের ওপর আরোপিত সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়া। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাবের সাধারণ কাঠামো মেনে নিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পর্যন্ত এই দাবি সরাসরি খণ্ডন করেনি।

সামরিক দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের মূল উপাদান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ এখনো সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ওপর তেহরানের প্রভাবও বহাল তবিয়তে রয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র তার সব সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছে, কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে এবং তাদের আঞ্চলিক প্রভাব সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

ঘরের ভেতরেও ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধ এবং তাঁর ব্যবহৃত ভাষা নিয়ে চারদিক থেকে চরম চাপে পড়েছেন। ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা মারা যাবে’—এমন ভয়াবহ হুমকি দিয়ে তিনি শুধু বিরোধীদের নয়, বরং নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর ও কংগ্রেসম্যানদেরও খেপিয়ে তুলেছেন। বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা আরও একধাপ এগিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি অপসারণ দাবি করেছেন।

বিশ্বের দৃষ্টিতে এই ক্ষতির মাত্রা আরও গভীর। একসময় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার রক্ষক হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেই বৈশ্বিক শৃঙ্খলার ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে একটি দেশের পুরো সভ্যতা ধ্বংসের হুমকি দিয়েছেন, ইতিহাসে এমন নজির নেই। এই ভাষা ও এই যুদ্ধ বিশ্বের বাকি দেশগুলো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে কীভাবে দেখবে, তা স্থায়ীভাবে বদলে দিতে পারে।

আপাতত যুদ্ধবিরতির ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে এবং শেয়ারবাজার চাঙা হয়েছে, কেবল এটুকু স্বস্তি মিলেছে। কিন্তু পরবর্তী দুই সপ্তাহের আলোচনা যে অত্যন্ত কঠিন হতে যাচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ইরানের দাবির দীর্ঘ তালিকা দেখলে সহজেই বোঝা যায়, এই যুদ্ধের প্রকৃত মূল্য চোকানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এখনো বাকি রয়েছে।