
বাংলাদেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে শুরুতেই যে দৃশ্যপট চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তা হলো এক চরম বৈপরীত্যের। একদিকে আমরা কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবার মতো কাঠামোর কথা বলে গর্ব করি, যার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ সেবা পাচ্ছে বলে দাবি করা হয় এবং বিপুলসংখ্যক দক্ষ জনবল গড়ে ওঠার গল্প শোনানো হয়। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের বাস্তব চিত্রটি বড্ড ভয়াবহ। এই এতসব দৃশ্যমান আয়োজনের পরও দেশের বিশাল একটি জনসংখ্যা আজও ন্যূনতম মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত।
উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে গেলে দেখা যায় চিকিৎসকের চেয়ারগুলো দিনের পর দিন ফাঁকা পড়ে আছে। স্বাস্থ্যকর্মীর যেমন তীব্র সংকট, তেমনি রয়েছে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম হাহাকার। বিশেষ করে চট্টগ্রামের আশেপাশের অঞ্চলগুলোর বাইরে প্রান্তিক সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নজর দিলে এই রূঢ় বাস্তবতা আরও প্রকটভাবে ধরা পড়ে। সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবাটুকু পান না। এর পেছনে মূল কারণ কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং স্বাস্থ্য খাতে সরকারের চরম আর্থিক দৈন্য এবং অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সদিচ্ছার অভাব।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে দেখা যায়, এশিয়া মহাদেশের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবায় পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো একেবারে তলানিতে অবস্থান করছে। প্রতি বছর যখন জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হয়, তখন স্বাস্থ্য খাতে কিছু চমকপ্রদ সংখ্যার কথা শোনা যায়। যেমন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে পরিচালন ব্যয়ের জন্য ২৪ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা মোট পরিচালন বরাদ্দের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ। আপাতদৃষ্টিতে অঙ্কটি বড় মনে হলেও বাস্তবায়নের চিত্র চরম হতাশাজনক। এই অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। প্রতি বছরই ঠিক এই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটে। বাজেটের শুরুতে মোট পরিচালন ব্যয়ের হয়তো ৪ শতাংশের সামান্য বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়, কিন্তু বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে সেই বরাদ্দ অনেকটা চুপসে যায়। আর প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব করলে সেটি নেমে আসে আরও নিচে।
দৃষ্টান্ত হিসেবে যদি আমরা পেছনের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই খাতে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৯ হাজার ৯৭৩ কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা, যা সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ঠিক এর আগের অর্থবছরেও সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা, আর ব্যয় হয়েছিল ১৫ হাজার ১৭২ কোটি টাকা (মোট ব্যয়ের ৩ দশমিক ৭ শতাংশ)। প্রশ্ন ওঠা খুব স্বাভাবিক যে, যেখানে চারদিকে সেবার জন্য এত হাহাকার, সেখানে বরাদ্দকৃত এই সামান্য অর্থটুকুও কেন খরচ করা যাচ্ছে না? এর উত্তর লুকিয়ে আছে পরতে পরতে ছড়িয়ে থাকা অদক্ষতা, কর্মহীনতা, দুর্নীতি ও চরম অব্যবস্থাপনার মাঝে। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে টাকা ছাড় করানো যায় না, আবার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে সেই টাকা কাজেও লাগানো সম্ভব হয় না।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে আমাদের এই দৈন্যদশা আরও প্রকট ও লজ্জাজনক হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত হেলথ ইকোনমিকস ইউনিট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, সুইডেন ও যুক্তরাজ্যের যৌথভাবে তৈরি করা একটি প্রতিবেদন আমাদের জন্য চরম হতাশার দলিল। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি অর্থায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, বরং পুরো বিশ্বেই অন্যতম সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। ২০১৯ সালের হিসাব বলছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার মোট ব্যয়ে সরকারি অংশগ্রহণ ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। এটি এতই নগণ্য যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ও চরম সংকটে থাকা আফগানিস্তানের চেয়েও আমরা পিছিয়ে ছিলাম। অথচ একই সময়ে মালদ্বীপ তাদের স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি হিস্যা রেখেছিল ১৯ দশমিক ১৫ শতাংশ। ভুটানের ছিল ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া শ্রীলংকারও ছিল ৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।
সময়ের সাথে সাথে আমাদের অবস্থার কোনো উন্নতি তো হয়ইনি, বরং অবনতি ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৩ সালের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৩ সাল শেষে সরকারের মোট ব্যয়ের স্বাস্থ্য খাতের অংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৫ শতাংশে। এই সময়েও মালদ্বীপ (১৫ দশমিক ৬ শতাংশ), ভুটান (১০ দশমিক ২ শতাংশ), নেপাল (৭ দশমিক ৭ শতাংশ), শ্রীলংকা (৬ দশমিক ৩ শতাংশ), পাকিস্তান (৪ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং ভারত (৪ দশমিক ৬ শতাংশ) আমাদের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক আরেকটি প্রতিবেদন এই লজ্জাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, পুরো বিশ্বের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যা মোট ব্যয়ের কেবল ১ দশমিক ১৯ শতাংশ। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গড়ে ৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলো গড়ে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ ব্যয় করে। এমনকি ঋণের দায়ে জর্জরিত গরিব দেশগুলোও তাদের মোট সরকারি ব্যয়ের অন্তত ৭ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখে। আর আমরা এক শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছি।
এই পরিসংখ্যানগুলো কেবলই কিছু গাণিতিক সংখ্যা নয়; বরং এগুলো একেকটি পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার করুণ গল্প। সরকারি হাসপাতালগুলোর এই বেহাল দশার কারণে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই ছুটছেন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের দিকে। হাতেগোনা কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল বাদ দিলে কোথাও ন্যূনতম আস্থার জায়গা নেই। কিন্তু বেসরকারি খাতে গিয়েও মানুষ স্বস্তি পাচ্ছেন না। সেখানে সেবার নামে চলছে চরম নৈরাজ্য ও অতিমাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণ। রোগীদের যথেষ্ট সময় না দেয়া, ভুল রোগ নির্ণয়, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ইচ্ছাকৃত বা অবহেলাজনিত ভুল রিপোর্ট প্রদান—এগুলো এখন নিত্যদিনের ঘটনা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নকল ও ভেজাল ওষুধের ভয়াল দৌরাত্ম্য, যা মানুষকে সুস্থ করার বদলে সরাসরি মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে দায়িত্বে অবহেলাজনিত মৃত্যুর ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। ফলে দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা আজ প্রায় শূন্যের কোঠায়। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা জীবনের ঝুঁকি না নিয়ে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার নিরিখে এটি আজ দিনের আলোর মতো স্পষ্ট যে, দেশের স্বাস্থ্য খাতে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে তার তিন ভাগের এক ভাগও দেয়া হয় না। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ওই অপর্যাপ্ত অর্থটুকুও আমরা পুরোপুরি ব্যয় করতে পারি না। কারণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়নি। পরিকল্পনার অভাবেই প্রয়োজনমাফিক বাজেট বরাদ্দ হয় না, আর যেটুকু হয় তা কাজে লাগানোর মতো প্রশাসনিক কাঠামো আমাদের নেই। কেবল বাজেট বাড়ালেই রাতারাতি এই খাতের ভোল পাল্টে যাবে না। সেই বরাদ্দকৃত অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় করার জন্য পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের সামর্থ্য তৈরি করা সবার আগে জরুরি। দেশের প্রতিটি মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার জন্য একটি পরিপূর্ণ কাঠামো তৈরি করে সেটিকে ধাপে ধাপে বিন্যস্ত না করলে সাধারণ মানুষের করের টাকা কখনোই সঠিক জায়গায় পৌঁছাবে না। অবকাঠামোগত উন্নয়ন তখনই সার্থকতা পায়, যখন একটি দেশের সাধারণ মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকু পায়।
লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।
