সোনাইমুড়ীতে তেলের পাম্পে কিশোরদের দীর্ঘ লাইন, অতিষ্ঠ পেশাজীবীরা


সারা দেশে চলছে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। অধিকাংশ পাম্পে মিলছে না ডিজেল, অকটেন, পেট্রলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল। দু-একটি পাম্পে তেল সরবরাহ করা হলেও তা খুবই সীমিত পরিসরে। আর সেই তেল সংগ্রহ করতে গ্রাহকদের দীর্ঘ সময় সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। লাইনে থাকা গ্রাহকদের অধিকাংশই উঠতি বয়সী শৌখিন বাইকার। এদের অনেকের নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স বা হেলমেট। ফলে অযথাই পাম্পগুলোতে ভিড় বাড়ছে এবং চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে জরুরি সেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায় রয়েছে আয়েশা ও হোসেন ফিলিং স্টেশন। প্রতিটি পাম্প থেকে সপ্তাহে মাত্র এক দিন তেল সরবরাহ করা হয়। দুপুর তিনটার পর থানা-পুলিশের উপস্থিতিতে তেল বিক্রি শুরু করে ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ। আর এ জন্য মোটরসাইকেল নিয়ে ভোর থেকেই সড়কের পাশ দিয়ে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত সিরিয়াল দিতে শুরু করেন জ্বালানি প্রত্যাশীরা।

সরেজমিনে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দীর্ঘ সারিতে উঠতি তরুণদের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া ১২ থেকে ১৪ বছরের কিশোরেরাও বাইক নিয়ে সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছে। এ সময় লাইনে থাকা অবস্থায় অনেকের মোটরসাইকেলের ট্যাংকি থেকে বোতলে তেল নামিয়ে রাখার দৃশ্যও চোখে পড়ে।

সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা পেশাজীবী মোটরসাইকেল চালকদের অভিযোগ, উঠতি বয়সী অনেকে অপ্রয়োজনে ভিড় বাড়াচ্ছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন চিকিৎসক, ওষুধ কোম্পানির পরিবেশক, কুরিয়ার ডেলিভারিম্যান, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদকর্মী, আইনজীবী ও ব্যবসায়ীদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশার মানুষেরা।

এ সময় কথা হয় সোনাইমুড়ী স্টেডফাস্ট কুরিয়ারের ডেলিভারিম্যান সোহাগের সঙ্গে। তিনি জানান, দুপুর ১২টার সময় সিরিয়ালে দাঁড়িয়েছেন। এখনো তাঁর সামনে প্রায় দেড় শ গাড়ি রয়েছে, যাঁদের অধিকাংশই বয়সে কিশোর। আক্ষেপের সঙ্গে তিনি বলেন, যারা বাবার টাকায় চলে, তারা অপ্রয়োজনে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে পেশাজীবী মানুষের কষ্ট বাড়াচ্ছে। এদের অনেকে তেল নিয়ে পরে বাইরে বিক্রি করে দেয়।

লাইনে থাকা পঞ্চাশোর্ধ্ব মো. আবদুল করিম দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি জানান, ব্র্যাকের সোনাইমুড়ী শাখায় কর্মরত আছেন তিনি। গত ১০ দিন ধরে তিনি কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো অটোরিকশায় চড়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করেছেন। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, শৌখিন চালকদের জন্য জরুরি সেবায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের চরম ভোগান্তি হচ্ছে। পেশাদার শ্রমজীবীদের চিহ্নিত করে দ্রুত তেল দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান তিনি।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সময় কথা হয় পশুচিকিৎসক মোশাররফ ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, পশুদের চিকিৎসা দিতে গ্রামের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে যেতে হয়। সেখানে মোটরসাইকেল ছাড়া যাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর। তবে তেলের জন্য সিরিয়াল দিতে গিয়ে দেখা যায়, উঠতি বয়সী বাইকচালকেরাই বেশি। তাদের জন্যই লাইন দীর্ঘ হয়। এদের অনেকে একবার তেল নিয়ে পুনরায় ট্যাংকি খালি করে আবারও লাইনে দাঁড়ায়। এসব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে পেশাজীবী চালকদের শনাক্ত করতে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র দেখে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়ার অনুরোধ জানান।

মেসার্স হোসেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. হোসেন জানান, ১১ দিন পর তাঁরা মাত্র সাড়ে ৪ হাজার লিটার তেল পেয়েছেন। দুপুর থেকে তেল দেওয়া শুরু হয়েছে। প্রতিটি মোটরসাইকেলে ৫০০ টাকার তেল দেওয়া হচ্ছে। পেশাজীবীদের শনাক্ত করে তেল দেওয়ার জন্য তাঁদের কোনো আলাদা ব্যবস্থা নেই। যেভাবে সিরিয়ালে আসছে, সেভাবেই তেল দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

চলমান এই জ্বালানি সংকটে পেশাজীবীদের ভোগান্তি কমাতে পরিচয়পত্র যাচাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সচেতন মহল।