
হামে শিশুমৃত্যু, টিকার ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের বকেয়া বেতন এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি নিয়ে জাতীয় সংসদে সরব হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশে ভ্যাকসিন ঘাটতি ছিল ঠিকই, তবে সরকার তা সামাল দিয়েছে; মজুত এখন স্থিতিশীল এবং জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
বুধবার (৮ এপ্রিল) স্পিকার হাফিজ আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে তৈরি হওয়া শূন্যস্থান, টিকা পরিবহনকারীদের নয় মাসের বকেয়া, বিভিন্ন জেলায় জনবল সংকট এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংক্রমণ বাড়ার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ৫ এপ্রিল থেকে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে, এডিপির অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা পুনর্বিন্যাস করে নতুন টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের আগেই সারা দেশে কর্মসূচি চালু করা হবে।
সংসদে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আরও বলেন, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে হামের পুনরুত্থান বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচওর মতে, একটি জনপদে হামের মহামারি রুখতে হলে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে দুই ডোজ এমআর টিকা দিতে হয়। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার ভাষ্য, কোভিড-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেই সুযোগ নিচ্ছে হামের ভাইরাস। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে নতুন করে টিকার কোনো অর্ডার দেওয়া হয়নি, আর টিকা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা গত নয় মাস ধরে কোনো বেতন পাননি। দেশের প্রায় ৩৫টি জেলায় টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের তীব্র ঘাটতি রয়েছে।
ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতার কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, বিশ্বজুড়ে হামের সংক্রমণ ৭৯ শতাংশ বেড়েছে এবং বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে ঢাকা, এর আশপাশের এলাকা এবং ঘনবসতিপূর্ণ শহুরে বস্তি এখন হামের হটস্পটে পরিণত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার বক্তব্যের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী টিকা পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত পোর্টারদের নয় মাস ধরে বেতন না পাওয়ার তথ্য অকপটে স্বীকার করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ, পোর্টাররা গত নয় মাস ধরে বেতন পান না, এটা সত্য। তবে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ বিষয়ে বৈঠক হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, পোর্টারদের বেতন দেওয়া সরকার পর্যায়ক্রমে আগামী দুই-এক দিনের ভেতরেই শুরু করছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্য খাতে কর্মীসংকট থাকলেও মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচি চালানোর সক্ষমতা রাখা হয়েছে। সরকার নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের দিকে যাচ্ছে। ঢাকাকে হটস্পট বলার বিষয়ে আংশিক দ্বিমত জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের তালিকায় পুরো ঢাকা শহর নয়, ১৮ জেলার কিছু কিছু উপজেলা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব জেলার মধ্যে বরগুনা, বরিশাল, ঝালকাঠি, চাঁদপুর, কক্সবাজার, মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, গাজীপুর, যশোর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর এবং ঢাকার নবাবগঞ্জ রয়েছে বলে সংসদে তথ্য দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ৫ এপ্রিল থেকে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মসূচি চালানো হবে। আগে ৩ মে থেকে সারা দেশে এই কর্মসূচি শুরুর কথা থাকলেও ইউনিসেফ থেকে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করা সম্ভব হওয়ায় এই কর্মসূচি এগিয়ে আনা গেছে।
সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বীকার করেন, টিকা সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যাঘাত, ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিলম্ব এবং আগের সময়ের ব্যর্থতায় সম্প্রতি ভ্যাকসিনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। তবে এখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়েছে দাবি করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন যে ভ্যাকসিনের মজুত এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও পরিবহনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী কোল্ড চেইন বজায় রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে সিঙ্গেল ডোজ ভায়াল থেকে মাল্টিডোজ ভায়ালে যাওয়া হচ্ছে, যাতে সংরক্ষণ সহজ হয়। সরকারি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোভিডকালীন মহামারি তহবিলের অব্যবহৃত ৬০৪ কোটি টাকা হাম-রুবেলাসহ জরুরি টিকা কেনার জন্য পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলেও সংসদকে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ইউনিসেফের মাধ্যমে ৪১৯ কোটি টাকার ভ্যাকসিন ক্রয় প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে ২০০ কোটি টাকার চালান পাওয়া গেছে। টেন্ডার না ডেকে সরাসরি ইউনিসেফের কাছ থেকে টিকা নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টেন্ডারে সময় লাগে এবং দুর্নীতি হয়। তা এড়াতেই সরাসরি ইউনিসেফ থেকে টিকা নেওয়া হচ্ছে। উচ্চ সংক্রমণ এলাকাগুলোতে সর্বশেষ ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ডোজ বিতরণ করা হয়েছে এবং হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য গ্যাভির মাধ্যমে সরকার মোট প্রায় ২ কোটি ১৯ লাখ ডোজ টিকা পেয়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জবাবের পর সম্পূরক প্রশ্নে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী অত্যন্ত সংবেদনশীল (সেনসিটিভ) হয়ে গেছেন। সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আরও বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোগীকে ভয় না দেখানোর যে কথা বলেছেন, তিনি তো জানতেন তিনি ৩০০ জন সংসদ সদস্যের সামনে কথা বলছেন। স্পিকার হাফিজ আহমদকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ৩০০ জন হামের রোগীর সামনে তো তিনি কথা বলছেন না।
এরপর সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা হামে শিশুমৃত্যুর পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৯৮ জন শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে, আর নিশ্চিত হামের সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। একটি সংবাদপত্রের তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, শুধু হাম নয়, ১০ রোগের টিকার সংকট দেখা দিয়েছে; ইপিআইয়ের কেন্দ্রীয় গুদামে কয়েকটি টিকার মজুত শূন্য, কিছু টিকার মজুত জুন পর্যন্ত চলবে।
এর জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মৃত্যুর পরিসংখ্যান যাচাই করার কথা বলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা নিজেই একটু পরস্পরবিরোধী কথা বলেছেন। এক জায়গায় ৯৮টি মৃত্যুর কথা বলেছেন, আবার নিশ্চিত মৃত্যুর কথাও বলেছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ সমীক্ষায় এ পর্যন্ত হামের কারণে ৪১ জনের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সংসদকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মহাখালীর সংক্রামক রোগ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের ওয়ার্ড পরিদর্শনে গিয়ে প্রথম শিশুমৃত্যুর পর তিনি কেঁদেছিলেন।
পরে স্পিকার হাফিজ আহমদ টিকার মজুত নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পিকার হাফিজ আহমদকে জানান, সরকার শূন্য মজুত থেকে পরিস্থিতি সামাল দিতে শুরু করেছে। এখন অর্থের সংস্থান হয়েছে, মন্ত্রিসভায় ৬০৪ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে। ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সহায়তা করছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সময়ের ঘাটতি কাটিয়ে টিকার শক্ত মজুত গড়ে তোলার কাজ চলছে।
