ফটিকছড়ির ধুরুংয়ে দিনভর মাছ ধরার উৎসব


চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ধুরুং নদীতে আবারও ফিরে এসেছে গ্রামীণ উৎসবের আবহ। বোরো চাষাবাদ শেষে নদীর বাঁধ খুলে দেওয়ায় গত রাত থেকে শুরু হয়েছে এই মাছ ধরার উৎসব। নদীর দুই পাড়ের স্থানীয় মানুষ জাল, খুঁটি জাল, হাত জাল, খেচা জালসহ নানা সরঞ্জাম নিয়ে নদীতে নেমে পড়েছেন। চলছে দল বেঁধে আনন্দঘন পরিবেশে মাছ শিকার।

ধুরুং মূলত এই উপজেলার একটি ছোট নদী, যা একসময় বড় ও রাক্ষুসে খাল হিসেবে পরিচিত ছিল। একমুখী প্রবাহবিশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এই নদীটির উৎপত্তি খাগড়াছড়ি জেলার লক্ষ্মীছড়ি উপজেলায়। এরপর কাঞ্চননগর ইউনিয়ন ও ফটিকছড়ি পৌরসভার সুন্দরপুর হয়ে এটি দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে গিয়ে মিশেছে।

স্থানীয় কৃষিকাজ ও জেলেদের জীবিকার সঙ্গে এই নদীর রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান ও সবজি চাষের সুবিধার্থে নদীর পানিতে একটি অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়, যা স্থানীয়ভাবে ‘বাঁধের পাড়’ নামে পরিচিত। কয়েক মাস পানি আটকে রেখে কৃষিকাজ পরিচালনার পর নির্দিষ্ট সময়ে সেই বাঁধটি খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে নদীর পানি কমে যায় এবং সেখানে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এবারও দেশীয় প্রজাতির রুই, কাতলা, মৃগেল, শিং, মাগুর, টেংরা, কৈ, শোলসহ নানা ধরনের মাছ ধরা পড়ছে। পাশাপাশি কার্প জাতীয় মাছ ও দেশীয় চিংড়িও মিলছে প্রচুর পরিমাণে। রাতভর মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আলম বলেন, এটি শুধু মাছ ধরার আয়োজন নয়, বরং স্থানীয়দের জন্য এক মহা আনন্দের দিন। ছোট-বড় সবাই নদীতে নেমে মাছ ধরেন। অনেকেই হয়তো মাছ পান না, তবুও কেবল আনন্দ উপভোগ করতে জাল নিয়ে পানিতে নেমে পড়েন।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ফোরক আহমেদ জানান, আগে এই উৎসব আরও বড় পরিসরে আয়োজিত হতো। প্রতি বছরই এলাকার মানুষ অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে এতে অংশ নিতেন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, ধুরুং নদী কেবল কৃষি সেচেই নয়, বরং এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। হালদা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ এখানে আশ্রয় নেয় এবং বেড়ে ওঠে। তাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

মাছ ধরার এই আয়োজন এখন ফটিকছড়ির গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বাঁধ খুললেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় ধুরুং নদী, আর সেই সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠে পুরো এলাকা। চাঁদের আলো, লণ্ঠনের ঝিলিক আর মানুষের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসে ধুরুং পরিণত হয় এক অনন্য মিলনমেলায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এই উৎসব আগামী প্রজন্মের কাছেও অবিকৃত অবস্থায় একইভাবে টিকে থাকবে।