একটি চিংড়ির পোনা ধরতে ধ্বংস হচ্ছে ১৭৬৩ প্রাণী!


মিরসরাইয়ে ফেনী নদীর বিভিন্ন স্থানে ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবৈধ ও অবাধে চলছে গলদা-বাগদা চিংড়ির পোনা আহরণ। প্রতিদিন লক্ষাধিক চিংড়ির পোনা আহরণ করা হলেও নদীতে আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না। এই চিংড়ির পোনা আহরণ করতে গিয়ে প্রতিনিয়তই ধ্বংস হচ্ছে হাজারো প্রজাতির মৎস্য ও জলজ প্রাণীর পোনা।

সম্প্রতি নদীর মুহুরী প্রকল্প এলাকা থেকে আহরণ করা প্রায় দুই লাখ টাকার চিংড়ি পোনা জব্দ করেন কুমিরা নৌ পুলিশের পরিদর্শক নাছির উদ্দিন। ওই দিন বেলা ১২টার দিকে সাগর থেকে চিংড়ি পোনা আহরণ করছিলেন খুলনা জেলার বেশ কয়েকজন মানুষ। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের কুমিরা নৌ পুলিশের পরিদর্শক নাছির উদ্দিন জানান, তাঁরা ফেনী নদীর মুহুরী প্রকল্প এলাকায় যান। সেখানে গিয়ে দেখেন বেশ কিছু মানুষ অবৈধভাবে সাগর থেকে চিংড়ি পোনা আহরণ করছেন। পরে তাঁদের কাছ থেকে এসব পোনা উদ্ধার করে কুমিরা নৌ পুলিশের পরিদর্শক নাছির উদ্দিন কিছুক্ষণের মধ্যেই তা সাগরে অবমুক্ত করেন।

নদীর বিভিন্ন স্থানে গিয়ে দেখা যায়, নিষিদ্ধ মশারি ও ঠেলা জাল দিয়ে জেলেরা লাখ লাখ চিংড়ি পোনা আহরণ করে বিক্রি করছেন স্থানীয় ব্যাপারীদের কাছে। ব্যাপারীরা সেগুলো দ্বিগুণ দামে বিক্রি করছেন খুলনা, বাগেরহাট ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরের মালিকদের কাছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মুহুরী প্রজেক্ট এলাকায় ফেনী নদীতে তখন শত শত মানুষ নিষিদ্ধ মশারি ও ঠেলা জাল দিয়ে চিংড়ির পোনা আহরণ করছেন এবং এই পোনাগুলোর জন্য তাঁরা ধ্বংস করছেন অন্য হাজারো মৎস্য ও জলজ প্রজাতি।

ফেনী নদীর মুহুরী সেচ প্রকল্প এলাকা থেকে শুরু করে মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী, বামনসুন্দর খাল পর্যন্ত এবং ছোট ফেনী নদীর কাজীরহাট স্লুইসগেট থেকে দক্ষিণে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত বিশাল উপকূলীয় এলাকায় প্রতিদিনই লাখ লাখ চিংড়ি পোনা আহরণ করা হচ্ছে। এতে খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মিরসরাই ও সোনাগাজী উপকূলীয় অঞ্চলের কয়েক হাজার মানুষ শুধু নদীতে চিংড়ি পোনা আহরণ করেই তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করছেন।

এসব স্থান ঘুরে দেখা যায়, জেলে, শিশু ও বৃদ্ধ সবাই মশারি ও ঠেলা জাল নিয়ে চিংড়ি পোনা আহরণ করছেন। জেলেরা শুধু বাগদা-গলদা চিংড়ির পোনা সংগ্রহ করে অন্যান্য মাছের পোনা ও জলজ প্রাণী ফেলে দিচ্ছেন। পোনা আহরণের জন্য এসব জেলে প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে তুলেছেন অবৈধভাবে অসংখ্য টিনের ঘর। এখান থেকে ঢাকা, খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার চিংড়ি ঘেরগুলোতে পোনা পাঠানো হয়। শুধু মুহুরী প্রজেক্ট এলাকা থেকেই দৈনিক লক্ষাধিক চিংড়ি পোনা বৃহত্তর ঢাকা ও খুলনা অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

মুহুরী রেগুলেটর এলাকায় গিয়ে কথা হয় শ্রীধাম মণ্ডল নামের এক মৎস্যজীবীর সঙ্গে। শ্রীধাম মণ্ডল এসেছেন খুলনা থেকে। শ্রীধাম মণ্ডল জানান, চিংড়ির পোনা আহরণ করার জন্য তিনি চার মাসের জন্য এ এলাকায় এসেছেন। স্থানীয় মহাজনের মাধ্যমে শ্রীধাম মণ্ডল নদী থেকে এ পোনা আহরণ করে প্রতি পিস ২ টাকা দরে বিক্রি করেন।

গোলাম রাব্বানি নামের খুলনা থেকে আসা আরেকজন জানান, গোলাম রাব্বানি প্রতিবছরই এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ মাসের জন্য এলাকায় চিংড়ির রেণু পোনা আহরণের জন্য আসেন। স্থানীয় কালু মিয়া মহাজনের মাধ্যমে গোলাম রাব্বানি পোনাগুলো বিক্রি করেন। একই এলাকা থেকে আসা আরেক জেলে জানান, তাঁরা নদী থেকে মশারির জাল দিয়ে অন্য পোনাসহ চিংড়ির পোনাগুলো আহরণ করেন। পরে চিংড়িটা রেখে অন্যগুলো ফেলে দেন।

আহসান উল্লাহ নামের স্থানীয় একজন জানান, চিংড়ির রেণু পোনা সংগ্রহ করার সময় কোরাল, কাঁকড়া, চিরিং, বাইলা, মলা, ডেলা, চেউয়া, তপসে, বাটা, চাপিলা, কুঁচিয়া, টেংরা, পোয়া, লইট্টা, ভেটকি, ইলিশ, কাঁচকিসহ আরও অনেক প্রজাতির পোনা আসে। তাঁরা শুধু চিংড়ি পোনা আহরণ করে বাকিগুলো ফেলে দেন। আহসান উল্লাহ আরও জানান, প্রতিটি চিংড়ি তাঁরা ভালো দামে বিক্রি করতে পারেন। অন্য মাছের পোনা নষ্ট হলে তাতে তাঁদের কোনো সমস্যা নেই।

স্থানীয়রা বলছেন, নিজাম জমিদার, মফিজ জমিদার (ক্যারপেডি) ও ওবায়দুল হকসহ অন্যরা প্রকাশ্যে ছোট ছোট ঘর করে খুলনা, বাগেরহাট ও যশোর থেকে লোক এনে এ ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সবার সামনেই ড্রামে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এসব পোনা, নেওয়া হচ্ছে না কোনো ধরনের ব্যবস্থা।

কামাল উদ্দিন ও শাহীনুল ইসলাম স্বপন নামের এলাকার দুই বাসিন্দা বলেন, এ অবৈধ কাজের ফলে নদী মাছশূন্য হয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা সিন্ডিকেটটি নদীর মাছ ধ্বংস করে দিচ্ছে। কামাল উদ্দিন ও শাহীনুল ইসলাম স্বপন জানান, এ অবৈধ কাজের জন্য বড় ধরনের কোনো জেল বা জরিমানার নজির নেই। যা হয় তা লোক দেখানো এবং নামকাওয়াস্তে বলে কামাল উদ্দিন ও শাহীনুল ইসলাম স্বপন ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে কথা হয় বিশিষ্ট মৎস্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহের সঙ্গে। প্রফেসর ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহ বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে চিংড়ির রেণু পোনা ধরা সরকারিভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। তারপরও সাগর মোহনা অঞ্চলের গরিব মৎস্যজীবীদের ঠেকানো যাচ্ছে না। তাঁরা অবৈধভাবেই নদী ও খাল থেকে গলদা ও বাগদার রেণু পোনা আহরণ করছেন। এ প্রবণতা আরও বেড়ে গেছে বিগত কয়েক বছরে হ্যাচারিগুলোতে কৃত্রিমভাবে পোনা উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে। এখন ঘেরমালিকরা সবাই গলদা চিংড়ির জন্য প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আছেন। এর ফলে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক মৎস্য সম্পদ দিন দিন মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

প্রফেসর ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহ আরও বলেন, এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একটি গলদা বা বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা আহরণ করতে গিয়ে অন্য ৪৬৩ প্রজাতির মাছের রেণু পোনা ধ্বংস হয়। আর সঙ্গে নদীর পানিতে বাস করা ক্ষুদ্র জীবকণা ধরা হলে তার সংখ্যা দাঁড়ায় ১৭৬৩টি। এটা সার্বিকভাবে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদের জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ। এটা কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বাংলাদেশের নদীগুলো ধীরে ধীরে মাছশূন্য হয়ে যাবে। আর নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বাংলাদেশের মৎস্য সম্পদ দিন দিন বাড়বে বলে প্রফেসর ড. মো. সাইফুদ্দিন শাহ মত দেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মিরসরাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম বলেন, তাঁরা প্রতিবছর অভিযান পরিচালনা করেন। এ বছরও অভিযান হবে। সব সময় না পারলেও মৌসুমে মাঝে মধ্যেই তাঁরা অভিযান পরিচালনা করেন। অবৈধভাবে চিংড়ি রেণু ধরার কাজে ব্যবহৃত জাল ধ্বংস করে দেওয়া হয় এবং চিংড়ি পোনাগুলো নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।

মিরসরাই উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম আরও জানান, এই পোনা আহরণে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ইলিশের। এতে হাজারো জলজ প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য দরকার ব্যাপক গণসচেতনতা ও জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান বলে আরিফুল ইসলাম উল্লেখ করেন।