মহেশখালীতে তেলের বিশাল মজুতাগার অব্যবহৃত পড়ে আছে কেন?


সরকার শাটডাউন পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে তেল মজুত রাখার অবকাঠামো হিসেবে মহেশখালীর সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করলেও চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেশনাল জটিলতা, সীমিত সংরক্ষণ সক্ষমতা এবং ব্যবস্থাপনাগত অনিশ্চয়তার কারণে প্রকল্পটি এখনো পুরোপুরি চালু করা যায়নি। ফলে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশের জ্বালানি খাত।

মহেশখালী দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে কালারমারছড়া সোনারপাড়া অংশে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল অবকাঠামো এখন কার্যত ব্যবহারের বাইরে। সরকারের ওপর প্রতিনিয়ত বাড়ছে বৈদেশিক ঋণের চাপ, অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও কমছে না। ফলে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এমন অবকাঠামো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতায় মহেশখালীর এসপিএম প্রকল্প এখনো সেই সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।

সরকারি সূত্র জানায়, সমুদ্রে অবস্থানকারী বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি খালাসের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কাজ শেষ হলেও বাস্তব ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি প্রকল্পটির। প্রকল্পের অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান মুরিং এবং সমুদ্রতল দিয়ে নির্মিত প্রায় ১১০ কিলোমিটার পাইপলাইন, যা স্টোরেজ সুবিধার মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে সংযুক্ত। এ ছাড়া পাম্পিং স্টেশন, অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সংরক্ষণ ট্যাংক, বুস্টার পাম্প এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও স্থাপন করা হয়েছে। পুরো নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে চীনের একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা করা হয়। অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল শাটডাউন অবস্থায় জ্বালানি ব্যাকআপ দেওয়া, জ্বালানি আমদানির সময় কমানো এবং ব্যয় সাশ্রয় করা। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় ট্যাংকার সরাসরি বন্দরে প্রবেশ করতে না পারায় গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস করতে হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এসপিএম চালু হলে একই প্রক্রিয়া কয়েক দিনের পরিবর্তে স্বল্প সময়ে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবে সেই সুবিধা এখনো মিলছে না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিকল্পিত সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রকল্পটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে বিদ্যমান প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা সীমিত থাকায় এসপিএম কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ কমে গেছে।

পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর না থাকায় প্রকল্পটি চালু করা সম্ভব হয়নি। পূর্ববর্তী সময়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা এগোলেও তা স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রস্তাবিত ব্যয় বেশি হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বান করা হলেও অংশগ্রহণ সীমিত ছিল এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখালেও অনেকেই শেষ পর্যন্ত প্রস্তাব জমা দেয়নি। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও বাস্তবতা যাচাই যথাযথভাবে করা হয়নি। সহায়ক অবকাঠামো প্রস্তুত না রেখেই বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পটি ব্যবহারের উপযোগী করতে নতুন করে পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান বলেন, কিছু কারিগরি ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকটের কারণে এখনো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে ২০২৪ সালে তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে কিছু তেল তাঁদের স্টোরেজে মজুত করে দেখেছেন।

এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান আরও বলেন, তাঁদের মূল উদ্দেশ্য হলো অপরিশোধিত তেল মজুত করে তা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানো। সেখান থেকে তেল পরিশোধিত হয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মেটাবে। চলতি বছরেই ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকট নিরসন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারবেন বলে এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান আশা প্রকাশ করেন।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চাহিদা, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তা না হলে বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে।