
৮ এপ্রিল ১৯৭১। ভোরের আলো উঁকি দিচ্ছে। দুটো বিস্কুট আর এক কাপ চা। মায়ের হাতের এই খাবার মুখে নিলেন। বাবা-মায়ের কাছ থেকে নিলেন বিদায়। পেছন ফিরেও আর তাকাননি। চোখে-মুখে তাঁর স্বাধীনতার নেশা। এই দেখাই ছিল শেষ দেখা। এরপর আর ফিরে আসেননি তিনি। তবে তাঁর ফিরে না আসাই বাঙালিদের এনে দিয়েছিল চিরমুক্তি। তাঁর ফিরে না আসাই বাঙালিকে এনে দিয়েছে কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
বলছিলাম ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪ সালের আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান সফল করে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে আত্মদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর শিক্ষার্থী আব্দুর রবের কথা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রথম জিএস ছিলেন তিনি। আজ তাঁর শাহাদাত বার্ষিকী। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিতে তিনি শহীদ হন। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে কিছু বিষয়ের আজ অবতারণা করছি।
বাঙালি জাতির গৌরবদীপ্ত দশক হলো ষাটের দশক। এই দশকে চট্টগ্রামের যে কজন ছাত্রনেতা নিজের যোগ্যতা ও কর্তব্যবোধে অবিচল থেকে নিজের ব্যক্তিত্বকে নেতৃত্বের স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন, শহীদ আব্দুর রব ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
শহীদ আব্দুর রব ১৯৪৮ সালে ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার কোটালীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মরহুম আবেদ আলী মিঞা। তাঁর পিতা বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা হিসেবে চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। সে সুবাদে তাঁর ছাত্রজীবন কেটেছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম শহরের এনায়েত বাজার কলিমউল্লাহ প্রাইমারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে তাঁর পড়াশোনার হাতেখড়ি।
এ স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে চট্টগ্রাম সরকারি মুসলিম হাইস্কুলে ভর্তি হন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা ছিল লক্ষ্য করার মত। মুসলিম হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তিনি স্কুলের ক্যাপ্টেন নির্বাচিত হন।
১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান ‘শিক্ষা কমিশনবিরোধী’ শিক্ষা আন্দোলনের মাঠে তিনি ছিলেন প্রথম সারিতে। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনামলে স্বৈরাচারী শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাইস্কুলের সমন্বয়ে গঠিত ‘মাধ্যমিক স্কুল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। সে সময় আন্দোলন নিয়ে তাঁর বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা ও কৌশলী ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
চট্টগ্রাম শহরে সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবেও তাঁর বেশ নামডাক ছিল। তিনি ১৯৬১-৬২ সালে শ্রেষ্ঠ স্কাউটার ও বক্তা হিসেবে পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৩ সালে দেশব্যাপী বন্যায় ও ঘূর্ণিঝড়ে যখন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী উপকূলের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন তিনি ছাত্রদের নিয়ে দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন। আব্দুর রব মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ১৯৬৪ সালে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালের দুর্যোগেও তিনি জনসাহায্যে রাস্তায় নেমে এসে নিঃস্বার্থ সমাজসেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। ১৯৬৭-৬৮ সালে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের নির্বাচনী দল যাত্রিকের মনোনয়ন নিয়ে কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে তিনি অন্যতম নীতিনির্ধারক ও সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন।
১৯৬৯ সালে গ্র্যাজুয়েশন লাভের পর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগকে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে সংগঠিত করতে তাঁর অবদান অপরিসীম। তিনি ১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পরে ছাত্রলীগের ব্যানারে দুস্থদের জন্য সেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়ে মানবতার সেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
আব্দুর রব ছিলেন এক অনন্যসাধারণ ছাত্রনেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। তিনি ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত বক্তা। তাঁর তেজদীপ্ত বক্তব্য লালদিঘি ময়দানের বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতাকে স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগঠিত ও উজ্জীবিত করেছিল। তাঁর বর্ণাঢ্য ও সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক জীবনে তিনি অংশ নিয়েছেন ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪ সালের আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৮ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে। বাঙালির মুক্তি সনদ ৬ দফা আন্দোলনের সময় পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
১৯৭১ সালের পহেলা মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে উত্তাল হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্তরের জনগণ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে শুরু হয় তখন অসহযোগ আন্দোলন। বঙ্গবন্ধুর একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য তিনি ছাত্রদের মাঝে উদ্দীপনা ও সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে কাজ শুরু করেন। চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য জনগণকে সংগঠিত করতে শুরু করেন কার্যকর তৎপরতা। ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নির্বিচারে শুরু করে হত্যাযজ্ঞ। দেশমাতৃকার টানে শত্রুকবলিত দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। চট্টগ্রাম শহর শত্রুর দখলে চলে গেলে শহীদ আব্দুর রব ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারত যাওয়ার পথে ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিল বর্তমান চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) সামনে পাহাড়ে ওঁৎ পেতে থাকা পাকিস্তানি সৈন্যদের গুলিতে শহীদ হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের প্রথম সাধারণ সম্পাদক (জিএস) আব্দুর রব।
বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন আমাদের মহান স্বাধীনতা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমাদের এ অর্জন। দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পথ পরিক্রমায় বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে অর্জন করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। আজ আমাদের আকাশে উড়ছে গৌরবোজ্জ্বল লাল সবুজের পতাকা। এ লাল সবুজের পতাকা অর্জন ইতিহাসের অন্যতম অংশীদার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ আব্দুর রব।
তাঁর বীরত্বগাথা ও গৌরবদীপ্ত ইতিহাস দেশ ও জাতির কাছে চিরভাস্বর, চির-অম্লান। আগামী প্রজন্ম তাঁর এ ত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে- এটিই আমাদের প্রত্যাশা।
ছাত্রলীগ, ষাটের দশকে চট্টগ্রাম শীর্ষক বইতে শহীদ আব্দুর রবের পিতা আবেদ আলী মিয়ার দেওয়া সাক্ষাৎকারে উঠে আসে কিছু কথা। তিনি এতে বলেছিলেন, ‘১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল। আনোয়ারা থানার বটতলী গ্রামে একজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছি। সেদিন সন্ধ্যায় কোথা হতে সেখানে রব এসে হাজির, ওকে পেয়ে সবাই উৎফুল্ল। সারারাত ভাই, বন্ধুবান্ধব নিয়ে গল্পগুজবে কাটাল সে। আমার সাথে বিশেষ কোনো কথা বলেনি। পরদিন ৯ এপ্রিল কাকডাকা ভোরে ওর মা ওর জন্য চা তৈরি করে দিল, সঙ্গে দুটো মাত্র বিস্কুট। আমি আর ওর মা সামনে বসে চা খাওয়া দেখলাম। আমি তখন মনে মনে কামনা করছি আমার ছেলে যেন নিরাপদে ভারতে যেতে পারে। যুদ্ধের দিন কার ভাগ্যে কী ঘটে বলা তো যায় না। তবুও আকুল হৃদয়ের প্রার্থনা ছিল যেভাবেই হোক আমার ছেলে যেন বেঁচে থাকে। চা খাওয়া শেষ হলে ওর পকেটে দশটি টাকা গুঁজে দিলাম। মনে মনে ভাবলাম ছেলের সাথে আবার দেখা হলে কিছু বেশি টাকা জোগাড় করে দেব। এরপর সবার কাছে বিদায় নিয়ে সে নিরুদ্দেশ যাত্রায় চলে গেল। তখনই কি ভেবেছি ওই দিনটাই হবে পুত্রের সাথে আমার শেষ দেখা।’
২০১৬ সাল। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধীনে মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ আমার। এর আগের কমিটিতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি। পরের কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন বন্ধু ফারুক আব্দুল্লাহ। সমিতির সাধারণ সভায় আমি প্রস্তাব করি শহীদ আব্দুর রবের স্মরণসভা আয়োজনের। সেদিনটি ছিল ২০১৬ সালের ৩ এপ্রিল। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা মাঠে নামি। হাতে সময় মাত্র ৯ দিন। আমরা সিদ্ধান্ত নিই চাকসুর সাবেক ভিপি, জিএস, এজিএস যারা দেশে আছেন তাদের মুখ থেকেই আমরা শুনব শহীদ আব্দুর রব এবং চাকসুর সোনালি অতীতের গল্প।
স্মরণসভায় যারা আসবেন তাদের মধ্যে শুধু একজনই প্রত্যক্ষভাবে দেখেছেন রবকে। শহীদ আব্দুর রবের বোন শাহনাজ পারভীনকেও আমরা দাওয়াত দিয়েছিলাম। উনি এসেছিলেনও এই আয়োজনে।
আয়োজনের দুইদিন আগে মাথায় এলো শহীদ আব্দুর রবের একটা সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত বের করি। হাতে সময় মূলত ২৪ ঘণ্টা। মস্তিষ্ক খুব দ্রুতই সাড়া দিল।
চাকসুর সাবেক ভিপি বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক এমপি মজহারুল হক শাহ’র সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম ওই বছর মার্চ মাসে, ওনার বাসায়। ওনার মেয়ে লোকপ্রশাসন বিভাগে পড়ুয়া সাবরিনা চৌধুরীর সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সাবরিনাই আমাদের তাঁর পিতা মজহারুল হক শাহ’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। তিন ঘণ্টার আড্ডায় এই কিংবদন্তি আমাদের অনেকগুলো বই দেখিয়েছিলেন। তাঁর মধ্যে ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিমের ‘ছাত্রলীগ- ষাটের দশকে চট্টগ্রাম’ শিরোনামে লেখা একটি বই। বইটি ওনার হাত থেকে নিয়ে চোখ বোলাতে লাগলাম। দেখলাম শহীদ আব্দুর রবকে নিয়ে স্রেফ দুই পৃষ্ঠা লেখা আছে। আমি সাথে সাথে মোবাইলে ওই দুই পৃষ্ঠার ছবি তুলে রাখলাম। সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত বের করার সিদ্ধান্ত নিয়েই ওই তথ্য কাজে লাগালাম। অনুষ্ঠানের আগের দিন একুশে পত্রিকার চিফ রিপোর্টার এবং চট্টগ্রামের অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে সুপরিচিত শরীফুল ইসলাম রুকনের সহযোগিতা নিয়ে রাতভর কাজ করে এই সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত বের করতে সক্ষম হই আমরা।
এই আয়োজন নিয়ে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতাও আছে। ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ অনুষদ মিলনায়তনে শহীদ আব্দুর রবের স্মরণসভা আয়োজন করা হয় সাংবাদিক সমিতির উদ্যোগে। সকাল ১০টায় প্রায় অতিথি অনুষ্ঠানস্থলে চলে এসেছেন। কিন্তু কিছু শিক্ষক ও সাংবাদিক সমিতির সদস্যরা ছাড়া আর তেমন কেউ আসেনি। পরে খবর নিয়ে জানতে পারলাম ছাত্রলীগের বিভিন্ন গ্রুপের নেতারা এই আয়োজনে কেউ যেন না যায় সে মেসেজ দিয়েছিলেন বিভিন্ন আবাসিক হলে। কারণ এটি তাদের জন্য লজ্জাজনক আয়োজন ছিল! তারা ক্যাম্পাসজুড়ে টেন্ডারবাজি, ফাও খাওয়া, গ্রুপিং মারামারিতে ব্যস্ত থাকতো তখন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার আয়োজন করার মতো মানসিকতা তাদের জন্মায়নি। তাই ক্যাম্পাসের একটি পেশাজীবী সংগঠন হয়ে সাংবাদিক সমিতির এই আয়োজন তাদের জন্য খুব একটা ভালো ‘মেসেজ’ ছিল না। যদিও আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছাত্রলীগ করা বন্ধু, বড় ভাই, ছোট ভাইদের কেউ কেউ এসেছিল এই আয়োজনে। সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও অনেকে এসেছিল সেদিন ছাত্রলীগের ‘বড় নেতাদের’ ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে।
উপস্থিতি কম হওয়ায় আমরা আয়োজনটি তাৎক্ষণিক উপাচার্য কনফারেন্স রুমে স্থানান্তর করতে সক্ষম হই। তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী এবং প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী স্যার এই আয়োজনটি সফল করতে আমাদের বেশ সহযোগিতা করেছিলেন।
সেদিন অনুষ্ঠানের প্রধান বক্তা ছিলেন চাকসুর সাবেক ভিপি মজহারুল হক শাহ চৌধুরী। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘চাকসু শহীদ আবদুর রবের স্মরণে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে পারেনি। তাঁর নামে হল তৈরি করতে তৎকালীন প্রশাসনকে ১১ দফা দাবি দিয়েছিলাম। অনেক আন্দোলনের পর তাঁর নামে হল করা হয়।’ সেদিন মজহারুল হক শাহ চৌধুরী চাকসু নির্বাচন আয়োজনেরও দাবি জানিয়েছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অন্যতম স্তম্ভ শহীদ আবদুর রবকে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় পরিসরে আমরাই সর্বপ্রথম স্মরণ করি। এরপর আর কেউ এভাবে আয়োজন করে তাঁকে স্মরণ করেছে কিনা জানা নেই।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের অন্যতম অংশীদার শহীদ আব্দুর রবের বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে শ্রদ্ধাভরে আজ স্মরণ করছি। এমন ছোট ছোট আয়োজনগুলোর নেতৃত্ব দিতে পারাই ক্যাম্পাস জীবনে পাওয়া আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।
