
বর্তমান বিশ্বে জ্বালানি তেলের দাম যখন আকাশছোঁয়া, তখন পেট্রোল-ডিজেলের এক বিস্ময়কর বিকল্প সামনে এনেছেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একদল তরুণ শিক্ষার্থী। প্রচলিত খনিজ তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে শৈবাল বা ‘অ্যালগি’ থেকে জৈব জ্বালানি তৈরি করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তারা।
রবিবার (১২ এপ্রিল) বেগমগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ে আয়োজিত ৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ, ১০ম অলিম্পিয়াড ও ১০ম বিজ্ঞান বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতায় এই অভাবনীয় উদ্ভাবন প্রদর্শন করা হয়। এই প্রজেক্ট উপস্থাপন করে কলেজ পর্যায়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে চৌমুহনী সরকারি সালেহ আহাম্মদ কলেজ।
কলেজের ২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের এইচএসসি পরীক্ষার্থী মো. আলামিন হোসেনের বিশেষ উদ্যোগে ও নেতৃত্বে তৈরি এই প্রজেক্ট মেলায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। খুদে এই বিজ্ঞানীদের দাবি, শৈবাল থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত এই ‘অ্যালগি অয়েল’ পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের বিকল্প হিসেবে সরাসরি ব্যবহার করা যাবে। এমনকি এটি বিমানের জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহারযোগ্য।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই জ্বালানি ব্যবহারের জন্য গাড়ির ইঞ্জিন পরিবর্তন বা কাস্টমাইজ করার কোনো প্রয়োজন হবে না। প্রচলিত ইঞ্জিনেই এটি অনায়াসে চলবে। গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবী যখন ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে, তখন এই জৈব জ্বালানি আশীর্বাদ হতে পারে। এটি পুড়লে বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
নিরাপত্তার দিক থেকেও এই শৈবাল তেল প্রচলিত জ্বালানির চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। সাধারণ তেল যেখানে সামান্য তাপে বিস্ফোরণের ঝুঁকি তৈরি করে, সেখানে এই অ্যালগি অয়েল ১৩০ থেকে ১৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপ সহ্য করতে পারে। ফলে পরিবহন ও সংরক্ষণের সময় বিস্ফোরণের ঝুঁকি প্রায় নেই বললেই চলে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও এই প্রজেক্টে দারুণ সুখবর রয়েছে। শৈবাল থেকে তেল নিষ্কাশনের পর অবশিষ্ট বর্জ্য ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এটি সাবান বা প্রসাধন সামগ্রী তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে, যা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।

মেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কায়েসুর রহমান। শিক্ষার্থীদের প্রশংসায় ভাসিয়ে ইউএনও কায়েসুর রহমান জানান, বেগমগঞ্জের শিক্ষার্থীরা খুবই উদ্ভাবনী মানসিকতার অধিকারী। তাদের প্রদর্শিত ৩৮টি প্রজেক্টের মধ্যে একটি কলেজ সরাসরি জেট ফুয়েলের বিকল্প উপস্থাপন করেছে।
ইউএনও কায়েসুর রহমান আরও জানান, তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্ন করে সন্তোষজনক উত্তর পেয়েছেন। বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে উঠলেই কেবল উন্নতি সম্ভব উল্লেখ করে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়কেই বিজ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
উপজেলা পর্যায়ের সব কলেজকে পেছনে ফেলে দলীয়ভাবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা আলামিন হোসেন ও তার দলের এই দূরদর্শী চিন্তার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন বিচারক ও দর্শনার্থীরা। উদ্ভাবক মো. আলামিন হোসেন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জানান, এই উদ্ভাবন কেবল মেলায় সীমাবদ্ধ না থেকে সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তা এক যুগান্তকারী মাইলফলক হতে পারে।
