রঙের ঢেউয়ে ভাসছে চট্টগ্রাম


নতুন বছরের প্রথম সূর্যকিরণ যেন আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল। সেই আলোর পরশ গায়ে মেখেই লাল-সাদা পোশাকের বর্ণিল স্রোত নেমেছে চট্টগ্রামের রাস্তায়। কোথাও ঢাকের বাদ্য, কোথাও রবীন্দ্রসংগীতের সুর, আবার কোথাও বা সমবেত কণ্ঠে আবৃত্তির মূর্ছনা—সব মিলিয়ে পুরো বন্দরনগরী যেন আজ এক বিশাল ক্যানভাস, যেখানে তুলির আঁচড় কাটছে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ‘নববর্ষের একতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’—এই উদ্দীপনামূলক প্রতিপাদ্যকে বুকে ধারণ করে চিরায়ত উৎসবমুখর পরিবেশে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিচ্ছে চট্টগ্রাম।

সকালের স্নিগ্ধতা কাটতে না কাটতেই সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণ রূপ নেয় এক টুকরো গ্রামীণ বাংলায়। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রায় মানুষের ঢল নামে। নানা রঙের মুখোশ, কুলো, হাতপাখা আর গ্রামীণ জীবনের প্রতীকী নানা উপকরণ হাতে নিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা পা মেলায় বর্ষবরণের এই আনন্দ মিছিলে। শোভাযাত্রাটি কাজীর দেউড়ি ও লাভ লেন মোড় হয়ে যখন ডিসি হিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন সবার নজর কাড়ে রাস্তার বুকে আঁকা বিশাল আলপনা। কাজীর দেউড়ি থেকে ডিসি হিল পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কজুড়ে এই রঙিন আলপনা উৎসবের আমেজকে যেন কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই আনন্দ আয়োজনে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি একাত্ম হয়েছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান এবং জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। প্রশাসনের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন হাসিমুখে সাধারণ মানুষের সাথে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলেন, তখন তাদের কথায়ও ঝরে পড়ছিল শেকড়ের টান। তারা মনে করেন, যান্ত্রিক শহরের বুকে এমন শেকড়সন্ধানী আয়োজন নতুন প্রজন্মকে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সাথে আত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে।

উৎসবে আসা প্রতিটি মানুষের চোখমুখেই আজ এক অন্যরকম প্রশান্তি। প্রিয়জনদের হাত ধরে অনেকেই বেরিয়ে পড়েছেন বছরের প্রথম দিনটির সাক্ষী হতে। এমন আনন্দঘন পরিবেশে কথা হয় পরিবার নিয়ে শোভাযাত্রায় আসা সংস্কৃতিকর্মী সাদিকুল ইসলাম এর সাথে। তার কণ্ঠে যেন ধ্বনিত হলো হাজারো নগরবাসীর মনের কথা। তিনি জানান, করোনা মহামারির সেই অবরুদ্ধ সময় এবং পরবর্তীতে পবিত্র রমজানের কারণে গত কয়েক বছর পয়লা বৈশাখের আয়োজনে কিছুটা ভাটা পড়েছিল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এবারের এই বাধভাঙা আয়োজনে অংশ নিতে পেরে তার মতো সবাই দারুণ উচ্ছ্বসিত।

শুধু ডিসি হিল নয়, সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন ছড়িয়ে পড়েছে শহরের প্রতিটি প্রান্তে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সিআরবি শিরীষতলার ছায়ায় নববর্ষ উদযাপন পরিষদ এবং রেলওয়ে অফিসার্স ক্লাবের আয়োজনে চলছে দিনব্যাপী গান, নৃত্য ও লোকজ উৎসব। অন্যদিকে, সেই ১৯৭৩ সালে চট্টগ্রামে প্রথম নববর্ষ উদযাপনের পথপ্রদর্শক বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী নন্দনকানন কাটাপাহাড় লেনে আজ সকাল থেকেই জমিয়ে তুলেছে তাদের চিরায়ত আয়োজন। জেলা শিল্পকলা একাডেমিও পিছিয়ে নেই, তাদের আঙিনাও মুখরিত দিনব্যাপী নানা পরিবেশনায়।

বাদ যায়নি কবিতার ছন্দ আর সুরের মূর্ছনাও। জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে বোধন আবৃত্তি পরিষদ চট্টগ্রামের ‘বোধন বর্ষবরণ উৎসব ১৪৩৩’ এবং সিজেকেএস মুক্ত মঞ্চে নরেন আবৃত্তি একাডেমির আয়োজন যেন অক্ষরে অক্ষরে প্রাণের সঞ্চার করছে। জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ বৌদ্ধ মন্দির সড়কে ‘আলপনার রঙে নববর্ষ আবাহন’ শেষে চট্টগ্রাম মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে দিচ্ছে সুরের মায়া। এমনকি আবাসিক এলাকাগুলোতেও লেগেছে এই বৈশাখী হাওয়া। পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকা কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে পিটুপি ও উইকনের সহযোগিতায় ‘জুলাই স্মৃতি উদ্যান’ তথা জাতিসংঘ পার্কে বসেছে দুই দিনব্যাপী বৈশাখী মেলা।

শহরের কোলাহল ছাড়িয়ে এই উৎসবের ঢেউ আছড়ে পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও। সেখানে লোকজ মেলা, পুতুল নাচ, বলিখেলা, বৌচি আর কাবাডির মতো গ্রামীণ আয়োজনে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে সত্যিকারের আবহমান বাংলা। পটিয়া সরকারি কলেজ মাঠেও দেখা মিলেছে এমনই আনন্দঘন পরিবেশের।

লাখ লাখ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত পদচারণায় কোথাও যেন কোনো ছন্দপতন না ঘটে, সেদিকেও রয়েছে কড়া নজরদারি। ডিসি হিল ও সিআরবির মতো জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে তৈরি করা হয়েছে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা বলয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এই বিপুল কর্মযজ্ঞের তদারকি করছেন। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, বাঙালির এই সর্বজনীন প্রাণের উৎসব যেন প্রতিটি নগরবাসী অত্যন্ত নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে উদযাপন করতে পারেন, সেই লক্ষ্যেই চারপাশের এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাজানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বৈশাখের এই তপ্ত দুপুরেও চট্টগ্রামের পথে পথে আজ কেবলই প্রাণের স্পন্দন। এই স্পন্দন একতার, এই স্পন্দন শেকড়কে ভালোবেসে নতুন দিনে এগিয়ে যাওয়ার।