সাজানো সংসার আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন লিলি, বিনিময়ে মিলল কেবলই মৃত্যু!


নয় বছর আগে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে যে মেয়েটি শ্বশুরবাড়িতে পা রেখেছিলেন, কে জানত সেই বাড়ি থেকেই অকালে তার নিথর দেহ বের হবে! চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের দক্ষিণ বন্দর এলাকার একটি বাড়িতে আজ কেবলই বিষাদের সুর। যে সংসার নিজের হাতে তিল তিল করে সাজিয়েছিলেন লিলি আকতার (২৭), সেই সংসারই যেন তার জন্য পরিণত হলো এক নির্মম মরণফাঁদে।

মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) দুপুরে সাবেক ইউপি সদস্য রাজিয়া সুলতানার (যিনি এলাকায় বোচা সুলতানা মেম্বার নামে পরিচিত) বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় লিলির রহস্যজনক ঝুলন্ত মরদেহ। তবে এই মৃত্যুকে নিছক আত্মহত্যা বলে মানতে নারাজ তার পরিবার। তাদের চোখে এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত নির্যাতনের এক সুপরিকল্পিত চূড়ান্ত পরিণতি।

স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায়, নয় বছর আগে মহিউদ্দিনের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় গুয়াপঞ্চক শাহ্ বাড়ি এলাকার মৃত কামাল উদ্দিন শাহ্‌র মেয়ে লিলির। তাদের কোল আলো করে আসে এক ছেলে ও এক মেয়ে। কিন্তু বাইরের এই স্বাভাবিক ছবির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ংকর কষ্ট। অভিযোগ রয়েছে, বিয়ের পর থেকেই শাশুড়ি রাজিয়া সুলতানা, স্বামী ও ননদ মিলে লিলির ওপর চালাত নানা রকম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

ঘটনার আগের রাতের চিত্রটি ছিল আরও বিষাদময়। শাশুড়ি রাজিয়া সুলতানা তার ছেলেকে নির্দেশ দেন বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার। মায়ের কথায় সায় দিয়ে স্বামী মহিউদ্দিন তড়িঘড়ি করে একটি ভাড়াবাড়ি ঠিক করেন এবং লিলিকে নিয়ে বেরিয়ে যেতে চান। কিন্তু লিলি তার এতদিনের সাজানো গোছানো সংসার, যে বাড়িতে তার শ্বশুর তাকে পরম যত্নে নিয়ে এসেছিলেন, সেই বাড়ি ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাতভর চলে তুমুল কথা কাটাকাটি।

লিলির ননদ মর্জিনা সুলতানার কথাতেও উঠে আসে সেই রাতের কিছু খণ্ডচিত্র। তিনি জানান, রাগের মাথায় তার ভাই লিলিকে বাপের বাড়ি বা ভাড়াবাড়িতে চলে যেতে বললে লিলি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, “আমার শ্বশুরের ঘর থেকে কোথাও যাব না। আমার শ্বশুর এ বাড়িতে আনছে। মরলে এ বাড়িতে মরব।” লিলির সেই অভিমানী কথাই যেন মর্মান্তিক নিয়তি হয়ে ফিরে এলো মঙ্গলবার সকালে।

সকালে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই দানা বেঁধেছে রহস্য। কারণ, গলায় ওড়না প্যাঁচানো থাকলেও লিলির পা মেঝের সঙ্গে লাগানো ছিল। এই দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের ছোট ভাই মোহাম্মদ পারভেজ উদ্দিন শাহ্। ভগ্ন হৃদয়ে তিনি বলেন, “নয় বছর ধরে আমার বোনকে ওরা নির্যাতন করেছে। পা মেঝেতে লেগে থাকা অবস্থায় কেউ ঝুলে মরতে পারে না। আমার বোনকে মেরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু বিচার চাই।”

খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় কর্ণফুলী থানা পুলিশ। তারা লিলির মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। এই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য লিলির স্বামী মহিউদ্দিনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়েছে। কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনূর আলম জানান, পুলিশ লাশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠিয়েছে এবং নিহতের স্বামীকে আটক করে এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এখন সবার অপেক্ষা কেবল ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য। লিলি কি সত্যিই অভিমানে পৃথিবী ছেড়েছেন, নাকি দীর্ঘদিনের নির্মম নির্যাতনের ফলেই তার এই মর্মান্তিক পরিণতি? হত্যা নাকি আত্মহত্যা—এই আইনি বিতর্কের মাঝেই এলাকার সাধারণ মানুষ ও লিলির পরিবারের একটাই দাবি, মৃত্যুর নেপথ্যে থাকা মানসিক নির্যাতনকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। লিলি হয়তো আর কোনোদিন তার সাজানো সংসারের অধিকার চাইতে আসবেন না, কিন্তু তার এই অকাল প্রস্থান পুরো এলাকায় রেখে গেল এক পাহাড়সম প্রশ্ন আর তীব্র একবুক হাহাকার।