
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ সংকটের সুযোগ নিয়ে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার ঠেকাতে দেশজুড়ে কঠোর নজরদারি বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকা ও সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা হচ্ছে, যেন কোনোভাবেই তেল পাচার হতে না পারে।
উপকূল ও সীমান্তে কোস্টগার্ড ও বিজিবির সাঁড়াশি অভিযান
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে কোস্টগার্ড এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ লাখ টাকা মূল্যের ৮৫ হাজার লিটার ডিজেল এবং ৫ হাজার লিটার পেট্রোল জব্দ করেছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫১ জনকে।
কোস্টগার্ড জানিয়েছে, গত ৪ এপ্রিল মিয়ানমারে পাচারকালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা উপকূলে ৬ হাজার লিটার ডিজেলসহ ১২ জনকে আটক করা হয়। আটককৃতদের মধ্যে আটজন রোহিঙ্গা এবং চারজন বাংলাদেশি নাগরিক। তাদের কাছ থেকে ছয়টি গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার ও নগদ ১৫ হাজার ৮০০ টাকা জব্দ করা হয়। এর আগে ২৬ মার্চ কর্ণফুলী নদীতে একটি লাইটার জাহাজ থেকে অবৈধভাবে মজুত করা ৩৭ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ করে কোস্টগার্ড।
অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সাতক্ষীরা, কুড়িগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানসহ ১৭টি সীমান্তবর্তী জেলায় অবৈধ জ্বালানি মজুত ঠেকাতে অভিযান চালানো হয়েছে। এসব জেলা থেকে ৬৪ হাজার ১৩১ লিটার তেল জব্দ এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
দেশব্যাপী সাড়ে ৯ হাজার অভিযান ও জরিমানা
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, দেশব্যাপী চলমান অভিযানে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত মোট ৫ লাখ ৪২ হাজার ২৩৬ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। এর মধ্যে সর্বাধিক ৩ লাখ ৬৬ হাজার লিটার ডিজেল, ৩৯ হাজার ৭৭৬ লিটার অকটেন এবং ৮৭ হাজার ৯৫৯ লিটার পেট্রোল রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামে পৃথক অভিযানে ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার ফার্নেস অয়েল জব্দ করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত সারাদেশে ৯ হাজার ১১৬টি অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার ৫১০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৯ হাজার ৬৫০ টাকা অর্থদণ্ড আদায় করা হয়েছে এবং বিভিন্ন অপরাধে ৪৫ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পুলিশের নজরদারি ও মজুতের কারণ
পুলিশ সদরদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রামসহ ২২টি জেলার ২৯টি স্থানে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুতের সন্ধান পেয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি অবৈধ মজুত পাওয়া যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও, পেট্রোল পাম্পগুলোতে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘ লাইন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশে প্রতিদিন গড়ে ১২ হাজার ৭৭৭ টন ডিজেল, ১ হাজার ১৯৩ টন অকটেন এবং ১ হাজার ৪৯৬ টন পেট্রোল বিক্রি হয়েছে।
একদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উত্তোলন কমে যাওয়ায় কনডেনসেট সংকট এবং বাজারে সিন্ডিকেটের কারসাজি মিলিয়ে চরম জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ডিপোতে সরবরাহ কম থাকায় পেট্রোল পাম্পগুলো চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অবৈধ মজুত গড়ে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার কার্যকর সমাধানে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, অবৈধ মজুতদারদের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
