
সাদা এহরামের শুভ্রতায় নিজেকে মুড়িয়ে আল্লাহর ঘরে হাজিরা দেওয়ার স্বপ্ন প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের হৃদয়েই লালিত হয়। হজ কেবল একটি দীর্ঘ দেশান্তর বা সাধারণ ভ্রমণ নয়; এটি শারীরিক কষ্ট ও আর্থিক ত্যাগের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ, যা আত্মশুদ্ধির সর্বোত্তম সুযোগ তৈরি করে দেয়। কিন্তু জীবনের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত এই পবিত্র ইবাদতে যদি সঠিক জ্ঞানের অভাবে কোনো ত্রুটি থেকে যায়, তবে তা অপূর্ণতার আক্ষেপ হয়েই রয়ে যায়।
এই আক্ষেপ থেকে রক্ষা পেতে এবং একটি ত্রুটিমুক্ত ইবাদতের মানসিক ও ব্যবহারিক প্রস্তুতির লক্ষ্যে শনিবার (১৮ এপ্রিল) চট্টগ্রামের জিন্নুরাইন কনভেনশন সেন্টারে বসেছিল এক মিলনমেলা। নগরীর দুই নম্বর গেট এলাকায় আসন্ন ২০২৬ সালের হজযাত্রীদের জন্য এই বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও পুনর্মিলনীর আয়োজন করে সরকার অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান বিসমিল্লাহ ওভারসিজ অ্যান্ড হজ সার্ভিস।
আয়োজনটি যেন ছিল পবিত্র মক্কা-মদিনার এক টুকরো আবহের পূর্বাভাস। সেখানে হজের আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ও গভীর তাৎপর্য নিয়ে হৃদয়গ্রাহী আলোচনা করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ড. মমতাজ উদ্দিন কাদেরী। তাঁর মতে, কেবল সঠিক জ্ঞান ও প্রস্তুতির মাধ্যমেই হজের পূর্ণ সওয়াব অর্জন করা সম্ভব। আল্লাহর নৈকট্য লাভের এই সুবর্ণ সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য বিসমিল্লাহ ওভারসিজের এমন সময়োপযোগী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।
হজযাত্রার প্রতিটি পদে রয়েছে নিয়মের কড়াকড়ি। এ বিষয়ে হজের আরকান-আহকাম, স্বাস্থ্যগত সতর্কতা এবং সফরের নিয়মাবলী নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও বিস্তারিত আলোচনা করেন হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সম্পাদক মাওলানা আবদুল মালেক। তাঁর কণ্ঠে ছিল সতর্কতার সুর; তিনি মনে করিয়ে দেন, হজের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে সামান্যতম অজ্ঞতা বা ছোট কোনো ভুলও অনেক সময় এই মহান ইবাদতের পরিপূর্ণতাকে নষ্ট করে দিতে পারে।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন ফারুক, সেইসাথে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে দিকনির্দেশনামূলক এবং তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য রাখেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব)-এর সাবেক সভাপতি শাহ আলম এবং আবুল কাশেম। তাঁদের বক্তব্যে হজের ব্যবহারিক দিকগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
হজযাত্রার দিনগুলোতে শারীরিক ও মানসিক শক্তির পরীক্ষা দিতে হয়। তাই হজযাত্রীদের অগাধ ধৈর্য ধারণ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। এই বিষয়গুলোর ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি হজের ব্যবহারিক নিয়মাবলী এবং মক্কা-মদিনার ঐতিহাসিক স্থানগুলোর পরিচিতি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেন বিসমিল্লাহ ওভারসিজ অ্যান্ড হজ সার্ভিসের মোয়াল্লেম মাওলানা মনছুর আলম কুতুবী এবং মাওলানা শামছুল ইসলাম হাকেমী।
অনুষ্ঠানটির সভাপতিত্ব করেন বিসমিল্লাহ ওভারসিজ অ্যান্ড হজ সার্ভিসের স্বত্বাধিকারী আবুল আনোয়ার। আগত হজযাত্রীদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে তিনি তাঁর প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আল্লাহর মেহমানদের পবিত্র যাত্রা যেন সর্বোচ্চ মাত্রায় সহজ, নিরাপদ ও নির্ভুল হয়, তা নিশ্চিত করাই তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য।
শুধু তাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই আয়োজন। কর্মশালায় ছিল এক প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর পর্ব, যেখানে হজযাত্রীদের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সরাসরি ও সাবলীল জবাব দেন আলোচকরা। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে আয়োজিত এই বাস্তবমুখী ও অংশগ্রহণমূলক প্রশিক্ষণ পর্বটি হজযাত্রীদের আসন্ন পবিত্র সফরের জন্য মানসিকভাবে আরও দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
