
চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামের জিমনেসিয়াম চত্বরে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা বইমেলা চট্টগ্রাম-২০২৬’ এর সমাপনী দিনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) বিকালে আয়োজিত ‘স্বাধীনতা পদক-২০২৬’ ও ‘সাহিত্য সম্মাননা পদক-২০২৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, সমাজ, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জাতির প্রতি তাঁদের অবদানের স্বীকৃতি। সম্মাননা প্রদানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতেই তাঁদের নির্বাচন করা হয়েছে।
ইতিহাস প্রসঙ্গে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ইতিহাসকে বিকৃত করার কোনো সুযোগ নেই এবং দেশের জন্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান দিতে হবে। ইতিহাস তার নিজস্ব ধারায় চলবে এবং ইতিহাসবিদরাই তা সংরক্ষণ করবেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আমাদের জাতির ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা, সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধে অবদান, সবকিছুই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শেখ মুজিবুর রহমান এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ সকল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে তাঁদের যথাযথ মর্যাদায় মূল্যায়নের আহ্বান জানান তিনি। ইতিহাসকে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখা উচিত নয় মন্তব্য করে তিনি আরও বলেন, কোনো ধরনের প্রোপাগান্ডা দিয়ে সত্যকে আড়াল করা সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির অর্জনকে শুধু এই অঞ্চলের নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয় বলে উল্লেখ করেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সাতটি বিষয়ে এক্রেডিটেশন অর্জন করা এ প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে একটি মাইলফলক। একইসঙ্গে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য নূর আহমদ চেয়ারম্যানকে সম্মাননা প্রদানের পেছনের যুক্তি তুলে ধরে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া আমাদের একটি দুর্বলতা ছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আসতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রেখে মরহুম জননেতা আবদুল্লাহ আল নোমানকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগঠক হিসেবে মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বইমেলার সফল আয়োজন প্রসঙ্গে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানান, এবারের মেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বই বিক্রি হয়েছে, যা পাঠাভ্যাস বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের জন্য একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পেরে সিটি করপোরেশন আনন্দিত এবং ভবিষ্যতেও এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আমিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. মনিরুজ্জামান, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস. এম. নছরুল কদির এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের সভাপতি সাহাব উদ্দিন হাসান বাবু।
এ বছর স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননার জন্য মোট আটজন ব্যক্তি ও তিনটি প্রতিষ্ঠানকে মনোনীত করা হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে অবদানের জন্য প্রয়াত রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আল নোমানকে (মরণোত্তর), মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. একরামুল করিমকে, শিক্ষাক্ষেত্রে চট্টগ্রাম পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান নূর আহমদ চেয়ারম্যানকে (মরণোত্তর), চিকিৎসাক্ষেত্রে ডা. এম. এ. ফয়েজকে এবং সাংবাদিকতায় দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম. রমিজ উদ্দিন চৌধুরীকে সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
এছাড়া ক্রীড়াক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান, সমাজসেবায় বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, স্বাস্থ্যসেবায় চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস), সঙ্গীতে শিল্পী আবদুল মান্নান রানা এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় অবদানের জন্য শিল্পী বুলবুল আকতার স্বাধীনতা স্মারক সম্মাননা লাভ করেন।
অন্যদিকে সাহিত্য সম্মাননা পদকের জন্য গীতিকবিতায় ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, শিশু সাহিত্যে সৈয়দ খালেদুল আনোয়ার, প্রবন্ধ ও গবেষণায় হারুন রশীদ, কবিতায় শাহিদ হাসান এবং কথাসাহিত্যে জাহেদ মোতালেবকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদের ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত এ বইমেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। সমাপনী অনুষ্ঠানে পদক প্রদান ছাড়াও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালনা করেন টিভি ও বেতার উপস্থাপিকা নাহিদা নাজু, চসিক স্কুলের শিক্ষিকা রুমিলা বড়ুয়া এবং কংকন দাস।
