
পেট্রোল পাম্পগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও জ্বালানি তেল পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। রেশনিং করা তেল নিতে ৭ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তেলের জন্য যখন দেশজুড়ে চরম হাহাকার ও জনদুর্ভোগ, ঠিক তখনই পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনকারী দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে জ্বালানি তেল নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ডিপোগুলোতে অকটেন রাখার কোনো জায়গা নেই, রীতিমতো উপচে পড়ার মতো অবস্থা। এ কারণেই বিপিসি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে অকটেন ও পেট্রোল নেওয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরবরাহ বন্ধ রাখতে দশ দিন আগে বিপিসি চিঠি দেওয়ায় মারাত্মক বিপাকে পড়েছে সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সরকারি পরিকল্পনায় পরিপক্বতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশে চাহিদার বড় একটি অংশের উৎপাদন হওয়ার পরও কেন মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের কোনো সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং স্থানীয় উৎপাদনকারীদের কাছ থেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি তেল কেনা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, জনদুর্ভোগ কমাতে এবং জ্বালানি তেল নিয়ে কোনো অব্যবস্থাপনা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার টন পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদা রয়েছে, যার ৭৫ ভাগই পূরণ করে দেশীয় পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ চাহিদাই মেটায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। অথচ গত ৮ এপ্রিল বিপিসি এই প্রতিষ্ঠানটিকে সরবরাহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে চিঠি দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ জানিয়ে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা ১৬ এপ্রিল বিপিসির চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছেন। তিনি জানান, ৫ এপ্রিলের বৈঠকে বিপিসির চাহিদা অনুযায়ী তারা প্রস্তুতি নিলেও এখন তেল নেওয়া হচ্ছে না। এতে তাদের ট্যাংকগুলো উপচে পড়ছে এবং দেশীয় এই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, দেশে অকটেন মজুতের সক্ষমতা ৫৩ হাজার টন হলেও বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ৫৫ হাজার টন। এর মধ্যে ১০ এপ্রিল ৩৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার পর বিপিসি আরও বিপাকে পড়েছে। কেরোসিনের ট্যাংকগুলো অকটেনের জন্য বিতরণ কোম্পানিগুলো সময়মতো প্রস্তুত করতে না পারাতেই এই বিপত্তির সৃষ্টি হয়েছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসানও জানান, অকটেন রাখার আর কোনো জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে অল্প অল্প করে বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে তেল নেওয়া হচ্ছে।
বিপিসির বিভ্রান্তিকর রেশনিং নীতির কারণেও জনমনে আতঙ্ক ও মজুতদারির প্রবণতা বেড়েছে। গত ৮ মার্চ থেকে সরকার তেলের রেশনিং শুরু করে, কিন্তু ঈদের আগে তা তুলে নিয়ে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বেশি তেল না দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। এই নির্দেশনার ফলেই পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন।
তবে অকটেন ও পেট্রোলে চরম সংকট থাকলেও ডিজেলে স্বস্তি ফিরছে। প্রতি মাসে প্রায় চার লাখ টন ডিজেলের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে এক লাখ টনের বেশি মজুত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত মাসে ডিজেল আমদানি ব্যাহত হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় চলতি মাসে চার লাখ ৭২ হাজার টন ডিজেল আসার কথা রয়েছে, যার মধ্যে দুই লাখ টন এরই মধ্যে দেশে পৌঁছেছে। বাকি তেল আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই দেশে ঢুকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
