গ্রীষ্মের শুরুতেই চট্টগ্রাম শহর ও গ্রামে তীব্র বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। নগরে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা এবং গ্রামে তা সাত থেকে আট ঘণ্টা পর্যন্ত গড়াচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে এসএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) জানিয়েছে, গ্যাস ও কয়লা সংকটের কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে।
পিডিবির চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ সার্কেল) এ কে এম মামুনুল বাশরী জানান, গ্যাস সংকটে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না, অনেক সময় বন্ধও রাখতে হচ্ছে। পাশাপাশি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সীমিত রাখা হয়েছে এবং কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে পানির স্তর কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬৭৮ মেগাওয়াট। কিন্তু গত এক সপ্তাহে উৎপাদন অর্ধেকেরও নিচে ছিল। পিডিবি সূত্র জানায়, গ্যাস সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ৪২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রাউজান বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে প্রায়ই দুই-তিনটি বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
বর্তমানে চট্টগ্রামে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় এক হাজার ৪০০ মেগাওয়াট হলেও প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
শহরের চেয়ে গ্রামে লোডশেডিংয়ের মাত্রা অনেক বেশি। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জ্যেষ্ঠ মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী নূর মোহাম্মদ জানান, তাদের এলাকায় প্রতিদিন ১৭০ থেকে ১৮০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
লোডশেডিংয়ের কারণে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম ও কৃষি সেচেও মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। লোহাগাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ইকবাল হোছাইন জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। সাতকানিয়ার সেচপাম্প মালিক জসিম উদ্দিনও সেচ সংকট নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেন।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, সারাদেশে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে শুরুতেই গ্রামে সরবরাহ কমানো হয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সমতাভিত্তিক লোডশেডিং হলে তা সবার জন্যই সহনীয় হতো। গ্রামের মানুষকে এভাবে বঞ্চিত করা দুর্ভাগ্যজনক।
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, গ্যাসের সরবরাহ কমেছে এবং দুটি কেন্দ্রে কয়লার স্বল্পতা আছে। আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে সব বিতরণ কোম্পানির মধ্যে সুষম হারে বিদ্যুৎ বিতরণ করার জন্য ইতোমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সরকারের আমলে জ্বালানি নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে এই সংকট ঘনীভূত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে ইন্দোনেশিয়া কয়লা রপ্তানি কমানোয় সংকট আরও বেড়েছে। এছাড়া বকেয়া বিলের কারণেও অনেক কেন্দ্র জ্বালানি তেল কিনতে পারছে না, যার প্রভাব পড়ছে সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে।

