
ছেলেটির নাম বাবু। বাবার মুখ তার মনে নেই স্পষ্ট করে। যখন বাবা চলে গিয়েছিলেন, তখন সে নেহাতই ছোট। তারপর একদিন দুইদিন করে কেটে গেছে মাস, মাস থেকে বছর, বছর থেকে দশক। বাবার কোনো খবর নেই। ফোন নেই, চিঠি নেই, টাকা নেই। শুধু আছে একটা অপেক্ষা— যেটা একসময় শোকে পরিণত হয়েছিল।
পরিবার ধরে নিয়েছিল, আমির হোসেন আর নেই।
কিন্তু তিনি ছিলেন। মালয়েশিয়ার পেনাংয়ের এক গহীন জঙ্গলের ভেতরে একটি ছোট্ট টিনের ঘরে— একা, নিঃসঙ্গ, মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায়।
যেভাবে শুরু হয়েছিল যাত্রা
১৯৯৬ সাল। শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার আমির হোসেন তালুকদার তখন তরতাজা মানুষ। সংসারের হাল ধরতে পাড়ি জমালেন মালয়েশিয়ায়। স্বপ্ন একটাই— বিদেশে কিছু রোজগার করে ফিরে আসবেন, পরিবারকে একটু ভালো রাখবেন।
প্রথম তিন বছর সব ঠিকঠাকই চলছিল। মালয়েশিয়ায় রঙের কাজ করতেন। নিয়মিত ফোন করতেন বাড়িতে। কিছু টাকাও পাঠাতেন। পরিবার ভাবত, এবার হয়তো আসবেন। কিন্তু আসা হয়নি।
তারপর হঠাৎই— নীরবতা।
কোনো ফোন নেই, কোনো চিঠি নেই। যেন পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেলেন এক মানুষ।
সাতাশ বছরের অন্ধকার
দিন গড়িয়ে যায়। বাবু বড় হয়। মা হয়তো রাতের অন্ধকারে কাঁদেন, কিন্তু ছেলের সামনে মুখে কিছু বলেন না। প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করেন, “কোনো খবর পাও?” উত্তর দিতে হয় না, কারণ মুখের নীরবতাই সব বলে দেয়।
একসময় পরিবার সিদ্ধান্তে আসে— তিনি আর বেঁচে নেই। হয়তো কোনো দুর্ঘটনায় মারা গেছেন, হয়তো কোনো অসুখে। বিদেশ-বিভুঁইয়ে কত মানুষ এভাবে হারিয়ে যায়।
কিন্তু ২০২৪ সালে একদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ছবি ভেসে ওঠে। পেনাংয়ের এক জঙ্গলে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশি হঠাৎ দেখতে পান একটি ছোট্ট টিনের ঘর। ভেতরে একজন বৃদ্ধ মানুষ— এলোমেলো চুল, বিভ্রান্ত চোখ, কথা বলছেন অসংলগ্নভাবে।
তারা থমকে যান।
জঙ্গলের ঘর থেকে ফেরার পথ
প্রবাসী সাংবাদিক বাপ্পি কুমার দাস এবং পেনাং প্রবাসী দিপু বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ছবি ও ভিডিও দেখে দেশে থাকা পরিবার চিনতে পারেন— এই মানুষটি আমির হোসেন। তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামী, হারিয়ে যাওয়া বাবা।
এরপর শুরু হয় আরেক লড়াই। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম এগিয়ে আসে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ট্রাভেল পাস দেয়। বিমানবন্দরে সিভিল অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি ও প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক সহায়তার হাত বাড়ায়।
২২ এপ্রিল, বুধবার। রাত ১২টা ২০ মিনিট। বাতিক এয়ারের একটি ফ্লাইট ঢাকার মাটি স্পর্শ করে। সেই ফ্লাইটে ছিলেন ৬২ বছর বয়সী আমির হোসেন তালুকদার।
সাতাশ বছর পর।
বিমানবন্দরে যে কান্না থামানো যায় না
বাবু তালুকদার দাঁড়িয়ে আছেন বিমানবন্দরে। যে বাবাকে তিনি চেনেন স্মৃতির ভেতর দিয়ে, সেই মানুষ এগিয়ে আসছেন। চুল পেকে গেছে, শরীর ভেঙে গেছে, চোখে সেই পুরনো আলো আর নেই হয়তো— কিন্তু তিনি আছেন। বেঁচে আছেন।
কতটা আবেগ জমে ছিল এই মুহূর্তের জন্য, তা ভাষায় বলা যায় না।
ব্র্যাক পরে তাকে শরীয়তপুরে পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে; তার শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একটি গল্পের আড়ালে হাজার প্রশ্ন
আমির হোসেনের ঘরে ফেরার গল্পটি সুখের। কিন্তু এর পেছনে যে দীর্ঘ বেদনার ছায়া, সেটি সহজে সরে যাওয়ার নয়।
একজন মানুষ কীভাবে বিদেশের মাটিতে এতটা একা হয়ে যান? কীভাবে একটি পরিবার সাতাশটি বছর অপেক্ষা করে, শোক করে, এবং তবুও ভোরে উঠে সংসার চালায়? প্রতিটি প্রবাসীর পেছনে এরকম একটি পরিবার থাকে, একটি অপেক্ষা থাকে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান যথার্থই লিখেছেন— “এমন সংকটে আরো কতোজন আছে তাও আমরা জানি না।”
সত্যিই, কতজন আমির হোসেন এখনো কোনো জঙ্গলের টিনের ঘরে বসে আছেন? কতজন বাবু এখনো বাবার অপেক্ষায় আছেন?
আমির হোসেন ফিরেছেন। কিন্তু তাঁর হারানো সাতাশটি বছর আর ফেরার নয়। ফেরে না সেই তরুণ বয়স, ফেরে না ছেলের শৈশব, ফেরে না স্ত্রীর যৌবন— যা কেটেছে একা একা, অনিশ্চয়তার ছায়ায়।
প্রবাসের স্বপ্ন অনেক সময় এভাবেই নীরবে ভেঙে যায়। আর সেই ভাঙার শব্দ পৌঁছায় না কোথাও।
