অস্তিত্ব সংকটে মাতামুহুরী: ৮ বছর ধরে বন্ধ ড্রেজিং, নাব্য সংকটে ধুঁকছে নদী


পলি জমে গভীরতা ও প্রস্থ কমায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে কক্সবাজারের চকরিয়ার বুক চিরে বয়ে যাওয়া মাতামুহুরী নদী। নদীর গতিপথ সংকুচিত হওয়ায় নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে নদী শাসন ও সংরক্ষণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতায় গত আট বছর ধরে থমকে আছে ড্রেজিং প্রকল্প।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমীক্ষা অনুযায়ী, বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মাইভার পর্বত থেকে উৎপত্তি হয়ে লামা ও চকরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে মাতামুহুরী নদী বদরখালী চ্যানেলে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। ১৪৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সর্পিলাকার এই নদীটির পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের নদী নং ১৩।

একসময় পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত, নৌ-চলাচল, সেচনির্ভর কৃষি এবং দেশীয় মাছের প্রাচুর্যে সমৃদ্ধ নদীটি এখন তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাচ্ছে। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে বর্ষায় নেমে আসা পলি, অবৈধ দখল, মাছ চাষের অপরিকল্পিত বাঁধ এবং নদী শাসনে ঘাটতির কারণে এই সংকট তৈরি হয়েছে। নদীর বুকে অসংখ্য বালুচর জেগে ওঠায় শুষ্ক মৌসুমে এটি প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। বর্ষার পর পাহাড়ি ঢল নামলে শুরু হয় তীব্র ভাঙন, যাতে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা ও ফসলি জমি।

চকরিয়া উপজেলার পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক বিএম হাবিব উল্লাহ জানান, চিরযৌবনা মাতামুহুরী এখন আর আগের রূপে নেই। আলীকদম থেকে চকরিয়ার বদরখালী পর্যন্ত একাধিক স্থানে নদীর আয়তন খালের মতো সরু হয়ে গেছে।

চকরিয়া উপজেলা পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান মাহমুদ জানান, একসময় সেচ ও দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত এই নদী এখন পাহাড় কাটা ও পলির কারণে মৃত্যুপথযাত্রী। নদী পুনরুজ্জীবনে ড্রেজিংসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, লামা ও আলীকদমে ব্যাপক বৃক্ষনিধন, জুমচাষ ও পাথর উত্তোলনের কারণে অতিবৃষ্টিতে পলি এসে নদীর তলদেশ ভরাট করছে। এর সঙ্গে ফাঁসিয়াখালী, কাকারা, বরইতলী, কোনাখালীসহ বিভিন্ন পয়েন্টে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের একটি চক্র। এতে নদীর তলদেশে গভীর খাদ সৃষ্টির পাশাপাশি ভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে।

২০১৫ সালে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ নদী পরিদর্শনের পর ড্রেজিংয়ের নির্দেশ দেন। এরপর ২০১৮ সালে ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চকরিয়ার বেতুয়াবাজার এলাকায় তিন কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং শুরু হলেও এক বছরের মাথায় তা বন্ধ হয়ে যায়।

নদীর এই বেহাল দশায় কৃষি ও মৎস্য খাতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার প্রায় ৬০ হাজার কৃষক সেচ সংকটে পড়ার শঙ্কায় আছেন। চকরিয়া জেলে সমিতির সভাপতি আশরাফ আলী জানান, গত ১৫ থেকে ২০ বছরে দেশীয় মাছের উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে, ফলে হাজারো জেলে পরিবার চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো বলেন, মাতামুহুরি শুধু জলধারা নয়, এটি একটি জীবনব্যবস্থা। সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া একে পুনরুদ্ধার কঠিন। তিনি ঢেমুশিয়া জলমহালের স্লুইস গেইট অপসারণের পাশাপাশি উজানের পরিবেশ রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানান।

সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কক্সবাজার কার্যালয়ের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী (চকরিয়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, উজান থেকে নেমে আসা পলি ও কৃত্রিম বাঁধের কারণে নাব্যতা সংকট তীব্র হয়েছে। ২০১৮ সালে ড্রেজিং করা হলেও পরের বছর তা আবার পলিতে ভরে যাওয়ায় প্রকল্পটি বাতিল হয়। তবে তিনি জানান, দুই বছর ধরে জাপানের দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে নদীর শাসন সংরক্ষণে গবেষণা চলছে, যা আগামী ছয় মাসের মধ্যে শেষ হবে এবং এরপর মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।

নদীর দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে চকরিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুপায়ন দেব বলেন, মাতামুহুরীতে অবৈধ দখল, বাঁধ ও ঘের তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ারের সঙ্গে আলোচনা করে নদী শাসন সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাবনা পাঠানো হবে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবেশবিদদের একটাই দাবি, মাতামুহুরীকে বাঁচাতে দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে।