
নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী-চাটখিল আঞ্চলিক মহাসড়কের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা পৌরসভার উন্মুক্ত ময়লার ভাগাড়ের দূষণ ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রহীন একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চিকিৎসা বর্জ্যসহ সাধারণ ময়লা খোলা জায়গায় ফেলে পোড়ানো হচ্ছে, যা মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।
মহাসড়কের পাশেই উপজেলার নদনা ইউনিয়নের পূর্ব কালুয়াই এলাকার বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন। স্থানীয় ইলিয়াস ভূঁইয়া বাড়ির বাসিন্দা মো. অনিক জানান, ভাগাড়ের দূষণে বিগত কয়েক বছরে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ওই বাড়ির তাজুল ইসলাম, নুরুন্নাহার ও আজিম নামে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ওই বাড়ির আরেক বাসিন্দা সালমা আক্তার জানান, ময়লার স্তূপে আগুন দিলে তার ছয় মাস বয়সী শিশুসহ অন্যদের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তীব্র দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রবে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে ‘সার্ভ বাংলাদেশ লিমিটেড’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে এক লাখ টাকা চুক্তিতে বর্জ্য অপসারণের কাজ করছে। ২০২২ সালে চুক্তির নবায়ন হলেও গত ১০ বছরে তারা পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র নেয়নি। প্রতিষ্ঠানটি সাধারণ ভ্যানে করে ক্লিনিক্যাল বর্জ্য এনে সাধারণ ময়লার সঙ্গে মিশিয়ে খোলা জায়গায় ফেলছে এবং পুড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসা-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮ অনুযায়ী ইনসিনারেটর বা অটোক্লেভ প্রযুক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হলেও তা মানা হচ্ছে না।

বর্জ্য পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও রয়েছেন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও শোষণের শিকার। পাবনা থেকে আসা পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাইনুর রহমান ও আমিন আলি জানান, তারা কোনো সুরক্ষাসামগ্রী বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই চিকিৎসা বর্জ্য পরিষ্কার করছেন। মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনের পাশাপাশি বাসাবাড়ি থেকে তোলা টাকার একটি বড় অংশ সুপারভাইজার আবু সামাকে দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন তারা। তবে সুপারভাইজার আবু সামা কর্মীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বর্জ্য অপসারণের নামে সোনাইমুড়ী পৌরসভা নাগরিকদের কাছ থেকে কর নেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটিও বাসাবাড়ি ও হোটেল থেকে আলাদাভাবে টাকা আদায় করছে। এ বিষয়ে সোনাইমুড়ী পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর সামসুল আলম দায়সারা জবাব দিয়ে সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
সার্ভ বাংলাদেশ লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. ফারুক দাবি করেন, তাদের লাইসেন্স আছে এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে।
তবে নোয়াখালী জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি এই তথ্য নাকচ করে জানিয়েছেন, ওই প্রতিষ্ঠান কোনো ছাড়পত্রের আবেদন করেনি। নিয়মবহির্ভূতভাবে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়ে প্রতিষ্ঠানটিকে লিখিত নোটিশ দিয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান তিনি।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এমন অনিয়ম নিয়ে সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক নাছরিন আকতার বলেন, পৌরসভার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান্টের কাজ চলছে, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এভাবেই চলবে। স্থানীয়দের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তিনি তাদের জন্য সরি, কিন্তু তারা এখন অপারগ।
