
বৈশাখের আগুনে জ্বলছে বাংলাদেশ। এপ্রিলের শুরু থেকেই যেন প্রকৃতি রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে। বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহে পা রাখতে না রাখতেই মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ গ্রাস করেছে কমপক্ষে ২০টি জেলা। আর এই দাবদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যে ভূত জেঁকে বসেছে জনজীবনে—তার নাম লোডশেডিং।
শহরের মানুষ কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও গ্রামবাংলায় চলছে এক নিদারুণ অন্ধকার যাত্রা—দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই। সরকার বলছে ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াট, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বিতরণ কোম্পানিগুলো জানাচ্ছে ভিন্ন চিত্র—লোডশেডিং ইতোমধ্যে চার হাজার মেগাওয়াটের দেয়াল টপকে গেছে।
কেন এই সংকট? উত্তর লুকিয়ে আছে হাজার মাইল দূরের যুদ্ধক্ষেত্রে। ইরান যুদ্ধ জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কয়লার সরবরাহ শৃঙ্খলে ভয়াবহ ধাক্কা দিয়েছে। দাম আকাশচুম্বী। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আনা হচ্ছে ঠিকই, তবে তাতে গুনতে হচ্ছে বহুগুণ বেশি দাম। শুধু মার্চ থেকে এলএনজি আমদানিতেই বাড়তি খরচ হয়েছে চার হাজার কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা—যা এখন তলানিতে। জুন পর্যন্ত চলতে আরও ১৯ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে জ্বালানি নেই, অন্যদিকে কেনার সামর্থ্যও নেই—এ যেন উভয় সংকটে পড়া এক জাতির অসহায় আর্তনাদ।
পরিসংখ্যান শুনলে চমকে উঠতে হয়। দেশে ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত উৎপাদনক্ষমতা ২৯,২৬৯ মেগাওয়াট। অথচ বছরের বেশিরভাগ সময় এই সক্ষমতার অর্ধেকটাই ঘুমিয়ে থাকে। বর্তমান চিত্র আরও ভয়াবহ। ১৮টি কেন্দ্র সম্পূর্ণ বন্ধ—১০টি গ্যাসভিত্তিক, ৮টি তেলভিত্তিক। ৩৫টি কেন্দ্রে উৎপাদন কমেছে—গ্যাসভিত্তিক ৯টি, তেলভিত্তিক ২৪টি, কয়লাভিত্তিক ২টি। এই কেন্দ্রগুলোর ৮৮ শতাংশই তেল, গ্যাস ও কয়লানির্ভর।
গত বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় পাওয়ার গ্রিডের তথ্য বলছে—চাহিদা ছিল ১৫,২১৮ মেগাওয়াট, সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২,৮৬৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ২,৩৫২ মেগাওয়াটের বিশাল গহ্বর। আর সন্ধ্যার পর সেই গহ্বর আরও গভীর হয়।
সংসদে প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য যেন সংকটের গভীরতাই তুলে ধরল। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত স্বীকার করলেন—এই উত্তপ্ত গরমে মানুষকে চরম দুর্ভোগ সইতে হচ্ছে। তবে তিনি বললেন, এটি এক দিনের সমস্যা নয়; এটি পুঞ্জীভূত সমস্যা, এবং এর জন্য বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করলেন।
বৈষম্য কমাতে তিনি জানালেন—এবার শহরেও লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরলেন জ্বালানি সংকটের নির্মম বাস্তবতা। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদনক্ষমতা ১২,১৫৪ মেগাওয়াট, অথচ বুধবার উৎপাদন হয়েছে মাত্র ৫,২৭৪ মেগাওয়াট—অর্থাৎ সক্ষমতার অর্ধেকও নয়। পুরো ক্ষমতায় চালাতে দৈনিক ২০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস দরকার, কিন্তু সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ৮৫ থেকে ৯২ কোটি ঘনফুট—চাহিদার অর্ধেকেরও কম। অর্থ সাশ্রয় করতেই ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ব্যবহারও কমানো হয়েছে।
দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের অবস্থাও সংকটকে আরও তীব্র করেছে। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট ২০২০ সাল থেকে বন্ধ, তৃতীয় ইউনিট গত নভেম্বর থেকে অচল, আর একমাত্র চালু থাকা প্রথম ইউনিটটিও বুধবার রাতে বন্ধ হয়ে গেছে। পাথর মিশ্রিত কয়লা ব্যবহারের কারণে চারটি কোল মিলের দুটি ভেঙে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে পুরো কেন্দ্রটি এখন সম্পূর্ণ উৎপাদনহীন—এক টুকরো অন্ধকারের প্রতীক।
এ সংকটের বাস্তব অভিঘাত পড়ছে দেশের নানা প্রান্তে। যশোরের অভয়নগরে দিনে চাহিদা ৩৭-৩৮ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ মিলছে ২৫-২৬ মেগাওয়াট। রাতে চাহিদা ৪৮-৪৯ মেগাওয়াট হলেও সরবরাহ ৩১-৩৫ মেগাওয়াটে সীমাবদ্ধ। ফলাফল—প্রতিদিন ১০-১২ ঘণ্টা অন্ধকার। মাগুরায় ১৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৮-৯ মেগাওয়াট। ফলে প্রতি দুই-তিন ঘণ্টা পরপর এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং চলছেই। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত, ব্যবসায়ীদের ক্ষতি বাড়ছে, সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠছে অতিষ্ঠ।
অর্থের জালে জড়িয়ে যাচ্ছে সংকট আরও দৃঢ়ভাবে। ২১ এপ্রিল অর্থ মন্ত্রণালয় ২,০৬৭ কোটি ৫ লাখ টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে। তবে শর্তও কঠিন—এই অর্থ শুধু বেসরকারি রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যবহার করা যাবে। পায়রা, রামপাল ও পটুয়াখালীর মতো বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভর্তুকি দেওয়া যাবে না। এমনকি পটুয়াখালীর ১,২৪৪ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটির ভর্তুকি আবেদনও অনুমোদন পায়নি। ফলে উৎপাদন ব্যবস্থায় তৈরি হচ্ছে নতুন সংকট।
সামনের দিনগুলো কী বার্তা দিচ্ছে? পিডিবির প্রক্ষেপণ বলছে, এই গ্রীষ্মে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। বর্তমানে গড় উৎপাদন ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে। অর্থাৎ তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াটের ঘাটতি নিত্যসঙ্গী হতে চলেছে। তবু কিছু আশার আলো আছে। আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বন্ধ ইউনিট ২৬ এপ্রিল চালু হতে পারে, বাঁশখালীর এসএস পাওয়ারের ৬৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ২৮ এপ্রিল থেকে বাড়তে পারে, এবং মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মোট ১,৯৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ যোগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা স্পষ্ট—জ্বালানি সংকট না কাটলে, অর্থের জোগান না বাড়লে, এই গ্রীষ্মে বাংলাদেশকে সামলাতে হবে এক অভূতপূর্ব বিদ্যুৎ সংকট। গ্রামের পাশাপাশি শহরেও অন্ধকারের ছায়া ঘনিয়ে আসছে। একটাই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে—এই জ্বলন্ত গরমে, পাখার বাতাস ছাড়া, কোটি মানুষ কীভাবে বাঁচবে?
