বাংলাদেশের ভূস্বর্গ বান্দরবান!


পৃথিবীর প্রত্যেক দেশেই সৌন্দর্য উপভোগ করার মতো কিছু না কিছু জায়গা রয়েছে। যেমন—ভারতের জম্মু-কাশ্মীর, অস্ট্রেলিয়ার সিডনি কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন শহর। ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও একটি ভূস্বর্গ রয়েছে। এই অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমির নাম আমাদের সবারই জানা, তবে কারও কারও কাছে এটি এখনও অজানা থাকতে পারে; যা মোটেও অসম্ভব কিছু নয়।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার পূর্বদিকে রয়েছে ভূস্বর্গ বান্দরবান পার্বত্য জেলা। সাতটি উপজেলা নিয়ে এই জেলা গঠিত। আজ থেকে ৩০-৩৫ বছর আগে এই বান্দরবানে মানুষ যেতে ভয় পেত। মশার কামড়, ম্যালেরিয়া কিংবা টাইফয়েডের আতঙ্কের পাশাপাশি যাতায়াতের দুর্গম পথ—তীব্র স্রোতের নদী পাড়ি দিয়ে নৌকায় করে সেখানে যেতে হতো। একসময় বাংলা সিনেমায় খলনায়কদের বলতে শোনা যেত, ‘বেশি বাড়াবাড়ি করলে বান্দরবান পাঠিয়ে দেব!’

কিন্তু পুরনো সেই প্রবাদের মতোই, ‘এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে।’ আজকের বান্দরবান সম্পূর্ণ ভিন্ন। হলদিয়া থেকে শুরু করে চারদিকে বিস্তৃত এই জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা হলো থানচি। কক্সবাজার বা সুন্দরবনের মতো একসময় মানুষ এখানে আসতে ভয় পেলেও, এখন লাখ লাখ টাকা খরচ করে পর্যটকরা এই প্রাকৃতিক ভূস্বর্গ উপভোগ করতে ছুটে আসেন।

সুন্দরবন বা কক্সবাজারের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলো ভ্রমণের জন্য বিশেষ ঋতুর প্রয়োজন হয়। কিন্তু বান্দরবান ভ্রমণে নির্দিষ্ট কোনো ঋতুর প্রয়োজন হয় না। আজ থেকে ১০-১৫ বছর আগেও মানুষ বান্দরবান বলতে বুঝত কেবল মেঘলা, নীলাচল, স্বর্ণমন্দির, মিলনছড়ি, প্রান্তিক লেক, শৈলপ্রপাত বা চিম্বুক পাহাড়। তবে বর্তমানে ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা চিম্বুক পেরিয়ে নীলগিরি, নীল দিগন্ত, তাজিংডং, বলীবাজারের শিলঝিরি, থানচি, রেমাক্রি, বড়পাথর, আমিয়াখুম কিংবা নাফাখুম পর্যন্ত অবাধে বিচরণ করছেন। একসময় নদীপথই ছিল একমাত্র ভরসা; রুমা, বলীবাজার হয়ে থানচি যেতে হতো। এখন সেই দিন বদলেছে। পাহাড়ি দুর্গম পথ কেটে তৈরি হয়েছে অসংখ্য রাস্তা, আর রাস্তার আশেপাশে গড়ে উঠেছে মনোরম সব পর্যটন স্পট। এখন আর আগের মতো বন্যপ্রাণী বা মশার ভয় নেই, পানীয় জলেরও কোনো সমস্যা নেই। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি গড়ে উঠেছে উন্নত মানের বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও রিসোর্ট, যার মধ্যে সাইরু হিল রিসোর্ট ও নীলগিরি অন্যতম।

বান্দরবান সব ঋতুতেই অপরূপ। গ্রীষ্মকালে গেলে চারদিকে মিলবে পাহাড়ি রসালো সব ফলফলাদি। রাস্তার আশেপাশের কচি ডাল আর অজস্র বনফুল যেন পরম মমতায় আপনাকে স্বাগত জানাবে। এরপর আসে বর্ষাকাল। বর্ষায় চিম্বুক বা নীলগিরির চূড়ায় দাঁড়ালে কিছুক্ষণের মধ্যেই সাদা মেঘ এসে আপনাকে আপন করে ঘিরে ধরবে। মনে হবে, আপনি মেঘের রাজ্যে খেলা করছেন! মেঘ ধরার এই অবিস্মরণীয় অনুভূতির জন্যই অনেক পর্যটক বর্ষাকালকে বেছে নেন। আবার শীতকালে বান্দরবান সাজে তার স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে। রুমা উপজেলার বিখ্যাত রিজুক ঝরনা এবং রহস্যময় বগালেক দেখার জন্য শীতকালই সেরা। এছাড়া আলীকদম রোডের ডিম পাহাড় এবং আলীর সুড়ঙ্গ পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়।

বম পাড়াগুলোতে গেলে সন্ধ্যার সময় ঘরে ঘরে শোনা যায় গিটারের মন মাতানো সুর। বান্দরবানে প্রায় ১১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস, যার মধ্যে মারমা সম্প্রদায় সংখ্যাগরিষ্ঠ। পাশাপাশি এখানে বাস করেন বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার মানুষও। সবার মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই, সবাই একে অপরের অকৃত্রিম বন্ধু। আর এ কারণেই বান্দরবানকে বলা হয় ‘সম্প্রীতির বান্দরবান’।

এককালে যেখানে কেবল তামাকের চাষ হতো, সেখানে আজ শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও মৎস্যসহ সার্বিক উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। বান্দরবানের শিক্ষার্থীরা এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, চুয়েট এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে সুনামের সঙ্গে পড়াশোনা করে জেলার মুখ উজ্জ্বল করছেন।

নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করা ছাড়াও অনেক পর্যটক এখানকার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করতে আসেন। বর্ষায় পাহাড়ি নদীগুলো ফিরে পায় তার উন্মত্ত যৌবন, আবার শীতে হয়ে ওঠে শান্ত ও স্নিগ্ধ। এই শান্ত নদীর মোহেই বড়পাথর, নাফাখুম, আমিয়াখুম বা তিন্দু দেখতে দলে দলে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসুরা। আমরা পর্যটকদের সবসময় স্বাগত জানাই। নাম না জানা কোনো এক আবেগী পর্যটক লিখেছিলেন, “যে বান্দরবান দেখেনি, সে যেন বাংলাদেশকেই দেখেনি।” কথাটি সত্যিই গভীর।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, পাহাড় হলো পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষাকারী পেরেক। এই পাহাড়, বন্যপ্রাণী, পশু-পাখি ও গাছপালা আমাদের অমূল্য জাতীয় সম্পদ। পাহাড়ের পাথর এবং বুনো কলাগাছগুলো পানি ধরে রেখে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে মূল ভূমিকা পালন করে। আমরা যদি নির্বিচারে গাছ ও পাহাড় কাটি, তবে পশুপাখির আবাসস্থল নষ্ট হবে, অক্সিজেনের পরিমাণ কমবে এবং পানির স্তর নিচে নেমে যাবে। প্রকৃতি তার ভারসাম্য হারালে আমাদের অস্তিত্বও বিপন্ন হবে। পৃথিবীটা শুধু আমাদের একার নয়, এটি প্রতিটি প্রাণের। আসুন, আমরা প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হই এবং নিজেদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে প্রমাণ করি।

বাংলাদেশের এই অপরূপ ভূস্বর্গ বান্দরবানে আপনাকে আমন্ত্রণ। তবে নিরাপত্তার স্বার্থে অবশ্যই প্রশাসনের নিয়ম মেনে চলবেন এবং নিবন্ধিত গাইড বা পথপ্রদর্শক সাথে রাখবেন!

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কাইচতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বান্দরবান সদর।