অভিশাপ থেকে আশীর্বাদ: মিরসরাইয়ের বাওয়াছড়া সেচ প্রকল্পে বদলেছে কৃষকের ভাগ্য


একসময় যে ছড়ার পানি ছিল গলার কাঁটা, বর্ষায় ডুবিয়ে দিত ফসলি জমি, বসতবাড়ি আর রাস্তাঘাট—সেই বাওয়াছড়ার জলেই এখন বোনা হচ্ছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন। আধুনিক সেচ ব্যবস্থার ছোঁয়ায় চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার মধ্যম ওয়াহেদপুর এলাকার দৃশ্যপট এখন পুরোপুরি ভিন্ন। এক সময়ের অভিশপ্ত পাহাড়ি ঢল আটকে তৈরি করা বাওয়াছড়া সেচ প্রকল্প এখন ১৫ নং ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কৃষকদের ভাগ্যলক্ষ্মী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কৃষিতে আধুনিকায়ন ও সেচ প্রযুক্তির মেলবন্ধনে প্রায় দুই হাজার একর অনাবাদি জমি এখন সারা বছরই সবুজ ফসলে ভরে থাকে।

বদলে যাওয়ার গল্প

মধ্যম ওয়াহেদপুর গ্রামের কৃষক সাইফুল্লাহ একসময় পাহাড়ি ঢলের আতঙ্কে দিন পার করতেন। কৃষক সাইফুল্লাহ জানান, বাওয়াছড়া প্রকল্পের ফলে বর্তমানে তারা পাহাড়ি ঢলের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন এবং প্রতিবছর সময়মতো প্রকল্পের পানি দিয়ে বোরো, আমনসহ বারোমাসি শাকসবজি চাষ করছেন। একই অভিজ্ঞতার কথা জানান দক্ষিণ ওয়াহেদপুর এলাকার কৃষক সাহাব উদ্দিন, শাখাওয়াত হোসেন এবং ননাই চন্দ্র নাথ। কৃষক সাহাব উদ্দিন, শাখাওয়াত হোসেন ও ননাই চন্দ্র নাথ একযোগে জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বর্ষা মৌসুমে শত শত ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকত এবং এলাকার মানুষ এই ছড়াকে অভিশাপ মনে করত। কিন্তু এখন এই লেকের পানি সাহাব উদ্দিন, শাখাওয়াত হোসেন ও ননাই চন্দ্র নাথদের মতো অসংখ্য প্রান্তিক কৃষকের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৫ সালে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন সেলিমের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই রূপান্তরের সূচনা হয়। সাবেক চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন সেলিমের উদ্যোগে ৩, ৫, ৬, ৭ ও ৯ নং ওয়ার্ডের কৃষকদের নিয়ে ‘বাওয়াছড়া পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড’ গঠিত হয়। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ বিতরণের পাশাপাশি এই সমিতির মাধ্যমেই পাহাড়ে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

সাবেক চেয়ারম্যান সালাউদ্দিন সেলিম জানান, ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে আগে বোরো চাষ হতো না এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে সবজি চাষও অসম্ভব ছিল। সালাউদ্দিন সেলিম আরও জানান, গত ১৯ বছর ধরে এই প্রকল্পের কারণেই প্রায় দুই হাজার একর জমিতে সফলভাবে বোরো চাষ হচ্ছে এবং মূলত সমিতিই পানি ব্যবস্থাপনার কাজটি করে আসছে।

পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২০০৫ সালে ৬০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এই দ্বিতীয় ক্ষুদ্রাকার পানি সেচ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। বারোমাসি বাওয়াছড়ার মুখে বাঁধ নির্মাণ ও পানি আটকানোর জন্য রেগুলেটর স্থাপন করা হয়, যা এলাকার স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনেও বড় ভূমিকা রেখেছে।

সবুজ বিপ্লব ও নতুন শঙ্কা

সমিতির নির্বাহী কমিটির সাবেক সদস্য মো. সেকান্দার মিয়া জানান, এখন বছরের যেকোনো সময় ওই এলাকায় গেলে আর কোনো অনাবাদি জমি চোখে পড়বে না, যা কেবল বাওয়াছড়া সেচ প্রকল্পের কারণেই সম্ভব হয়েছে। তবে মো. সেকান্দার মিয়া একটি উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, প্রকল্পটি স্থাপনের পর লেকের গভীরতা ছিল ৩০ মিটার, কিন্তু পাহাড়ি বালু ও মাটি জমে তা ১০ মিটার ভরাট হয়ে গেছে। ফলে আগের মতো পানি সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। তাই কৃষির এই ধারা অব্যাহত রাখতে মো. সেকান্দার মিয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লেকটি দ্রুত সংস্কারের জোর দাবি জানিয়েছেন।

সেচ প্রকল্পের পাশাপাশি এই লেকটি এখন বহুমুখী আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। সমবায় সমিতির উদ্যোগে লেকে কার্প জাতীয় মাছের চাষ করা হচ্ছে, যেগুলো ইতোমধ্যেই ৩ থেকে ৫ কেজি ওজনের হয়েছে। ১০ একর আয়তনের এই লেকের স্বচ্ছ নীল জলরাশি পর্যটকদেরও মুগ্ধ করছে। ইতোমধ্যে বারৈয়াঢালা ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষ বাওয়াছড়া ঝরনাকে ইজারা দিয়েছে, যা এলাকার অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সার্বিক কৃষি উন্নয়ন নিয়ে মিরসরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় বেশ আশাবাদী। তিনি জানান, বাওয়াছড়া সেচ প্রকল্পের কারণে দুই হাজার একর অনাবাদি জমিতে এখন চাষাবাদ হচ্ছে এবং প্রতি বছরই কৃষি বিভাগ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

প্রতাপ চন্দ্র রায় আরও জানান, লেকে সংরক্ষিত পানি দিয়ে কৃষকরা বোরো চাষ, আউশের বীজতলা প্রস্তুত এবং রবিশস্য হিসেবে চিচিঙ্গা, ঝিঙা, লাউ, বরবটি, ধুন্দুল ও চিনাবাদাম চাষ করছেন। ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মুখেও এখন তৃপ্তির হাসি ফুটেছে।