রাজনীতিতে ‘গুপ্ত’ ধারণায় লেনিন ও ইসলাম


বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর একটি দৃশ্যমান ও আলোচিত বিষয়। বিভিন্ন শব্দের রাজনীতি এই রূপান্তরকে করেছে সমৃদ্ধ। অতি সম্প্রতি একেবারেই নতুন ধারণার রাজনৈতিক শব্দ ‘গুপ্ত’-এর দেখা মিলেছে। তাই গুপ্ত বা গোপন রাজনীতি নিয়ে কিছু পড়াশোনার চেষ্টা করলাম।

ভাবলাম, বন্ধুদের সঙ্গে ‘গুপ্ত’ ধারণার একাল-সেকাল যা জানলাম তা শেয়ার করি। আমার এই লেখায় কোনো ভুল থাকলে, তা শুধরে দিলে কৃতজ্ঞ থাকব। আমি চেষ্টা করেছি রাজনৈতিক বোদ্ধাদের কেউ এই গুপ্ত ধারণাকে কীভাবে দেখেন তা তুলে ধরার। লেনিনের চিন্তা, ম্যাকিয়াভেলিয়ান নীতি কিংবা ইসলামি রাজনীতিতে গুপ্ত চর্চাকে কীভাবে দেখা হয়—তা কিছুটা জানার চেষ্টা করেছি। অল্পতেই যা বুঝেছি, তা-ই শেয়ার করলাম।

ভ্লাদিমির লেনিন বিপ্লবী রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রকাশ্য (Legal/Open) এবং অপ্রকাশ্য বা গোপন (Illegal/Underground)—উভয় ধরনের কৌশলের সংমিশ্রণের ওপর জোর দিতেন। এটি লেনিনবাদী সংগঠনের একটি মূল ভিত্তি।

রুশ জারের শাসনামলে বা নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রে বিপ্লব টিকিয়ে রাখার জন্য লেনিন গোপন পার্টি সংগঠনের পক্ষে ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিপ্লবী তত্ত্ব এবং কর্মপরিকল্পনা রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা নজরদারির বাইরে গোপন রাখা অপরিহার্য। একইসঙ্গে, লেনিন ট্রেড ইউনিয়ন, শ্রমিক সভা বা পার্লামেন্টে (যেখানে সুযোগ ছিল) কাজ করার পরামর্শ দিতেন। তিনি মনে করতেন, জনসাধারণের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সংগঠিত করার জন্য প্রকাশ্য কাজও গুরুত্বপূর্ণ।

‘What is to be Done?’ শিরোনামে লেখা বই এবং অন্যান্য লেখায় লেনিন বলশেভিক পার্টির জন্য এমন কঠোর সাংগঠনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে দক্ষ বিপ্লবীরা গোপনে কাজ পরিচালনা করত এবং সাধারণ কর্মীরা প্রকাশ্য কাজ করত। এই দ্বৈত রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল—দমনপীড়নের মধ্যেও পার্টির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং একইসঙ্গে সাধারণ শ্রমিক-জনতার মধ্যে প্রভাব বিস্তার করে বিপ্লবের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।

ইসলামের আলোকে রাজনীতি একটি ব্যাপক ও নীতি-নৈতিকতাভিত্তিক বিষয়। এখানেও গোপন রাজনীতি প্রচলিত ছিল। এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বলা হতো। এই গোপন রাজনীতির মূল লক্ষ্য ছিল সততা, আমানতদারিতা এবং জনকল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়া। ইসলামের দৃষ্টিতে গোপনীয়তা নিন্দনীয় নয়; বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা মানুষের কল্যাণের স্বার্থে কৌশল গোপন রাখা বৈধ।

তবে ইসলামি রাজনীতিতে ক্ষমতার জন্য অনৈতিক উপায় বা প্রতারণা (ধোঁকাবাজি) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইসলামে ক্ষমতায় যাওয়া কোনো বৈষয়িক লক্ষ্য নয়, ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য হলো ন্যায়বিচার ও আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠা করা।

শত্রুর মোকাবিলা বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ‘War is deceit’ (যুদ্ধ একটি কৌশল) নীতি আছে। হাদিসের আলোকে যুদ্ধের ময়দান বা অমুসলিম শত্রুর বিরুদ্ধে কৌশলগত গোপনীয়তা অবলম্বন করা জায়েজ। কিন্তু নিজ নাগরিক বা মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে গোপন চক্রান্ত বা মিথ্যাচার করা সম্পূর্ণ হারাম। গোপন রাজনীতি বা দলীয় স্বার্থ যদি মুসলিম উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরায়, তবে তা বর্জনীয়।

ইসলাম এমন গোপন রাজনীতির বিরোধী, যেখানে মানুষকে মিথ্যার মাধ্যমে ধোঁকা দেওয়া হয় বা ক্ষমতা অর্জনের জন্য যেকোনো উপায় (ম্যাকিয়াভেলিয়ান নীতি) গ্রহণ করা হয়।

ম্যাকিয়াভেলিয়ান নীতি হলো ইতালীয় দার্শনিক নিকোলো ম্যাকিয়াভেলির রাজনৈতিক দর্শন, যা ক্ষমতা অর্জন ও ধরে রাখার জন্য যেকোনো উপায় (ছলনা, নিষ্ঠুরতা, ধূর্ততা) ব্যবহারকে সমর্থন করে। এর মূলমন্ত্র ‘The end justifies the means’। অর্থাৎ লক্ষ্যই উপায়ের যথার্থতা নির্ধারণ করে। এই নীতি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য শাসকের নৈতিকতার ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করাকে সমর্থন করে।

ম্যাকিয়াভেলির ধারণা, মানুষ জন্মগতভাবেই নাকি শঠ, প্রতারক আর বিশৃঙ্খল – ডাণ্ডা ছাড়া ঠাণ্ডা থাকে না। ইতিহাস নাকি শুধুই বিজয়ীদের সৃষ্টি। ধার্মিকতার চেয়ে ভান ধরে থাকা নাকি অধিক গুরুত্বপূর্ণ! এত বিতর্কিত কথাবার্তা বলার পরও দ্য প্রিন্স-খ্যাত ম্যাকিয়াভেলিকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।

নৈতিকতার সাথে শাসনের কর্তৃত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শাসন তিনিই করবেন যিনি নিজে সৎ। দেশ শাসন করতে গেলে নীতিবান হতে হবে, সৎ হতে হবে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের সাথে থাকতে হবে মিল। এটা অত্যন্ত প্রচলিত একটি বিশ্বাস যে, সততা ও নৈতিকতা দিয়েই জনসাধারণের শ্রদ্ধা ও আনুগত্য আদায় করা যায়। এটি ইসলামের মূল নীতির মধ্যেই পড়ে।

কিন্তু ম্যাকিয়াভেলি ঠিক এ বিষয়টিতেই সজোরে আঘাত করেছেন তাঁর দ্য প্রিন্স গ্রন্থের মাধ্যমে। নিজ দেশের শাসককে দেশ চালানোর জন্য সাদামাটা কিছু প্রায়োগিক জ্ঞান দেওয়াই ছিল দ্য প্রিন্স-এর মূল উদ্দেশ্য, সাহিত্যচর্চা নয়। তাঁর মতে শাসনক্ষমতার বৈধতা কোনো নৈতিকতার মাপকাঠিতে আবদ্ধ নয়; কর্তৃত্ব আর ক্ষমতাই এখানে মূল বিষয়। যার ক্ষমতা আছে সে-ই শাসন করবে, নৈতিকতা কাউকে ক্ষমতায় বসায় না।

সততা ও নৈতিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে ম্যাকিয়াভেলি বলছেন যে, ক্ষমতা অর্জন আর ক্ষমতা রক্ষা করাই রাজনীতির মূল নীতি। ক্ষমতার উপযুক্ত ব্যবহার দিয়েই জনগণের আনুগত্য অর্জন করতে হয়। রাজনীতি মানেই হলো ক্ষমতা ‘গ্রহণ আর প্রয়োগের’ নীতি। শাসকের প্রতি জনগণের ভালোবাসা এবং জনগণের ভয় দুটোই থাকতে হবে। যদি দুটোই না থাকে সেক্ষেত্রে ভয়টি অন্তত থাকতে হবে।

কিন্তু ইসলাম এই নীতি সমর্থন করে না। ইসলামের দৃষ্টিতে রাজনীতি হতে হবে খোদাভীতি, ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কৌশলগত গোপনীয়তা শুধু ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার খাতিরে অনুমোদিত, ষড়যন্ত্রের জন্য নয়।

রাসুল (সা.)-এর ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গোপন সংগঠনের ধারণা পাওয়া যায়। এই ধারণা ইসলামি বিপ্লবের কৌশল ও সংস্কৃতির একটি চাঞ্চল্যকর অধ্যায়।

আল্লাহর রাসুলের (সা.) সাহাবি আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.) ছিলেন কুরাইশ বংশের মাখজুম গোত্রের সদস্য। তাঁর বাবা আবুল আরকাম নামে পরিচিত ছিলেন যার আসল নাম আবদে মানাফ ইবনে আসাদ ইবনে উমর ইবনে মাখজুম এবং তাঁর মা ছিলেন বনু খুজাআ গোত্রের উমাইমা বিনতে আল হারিস। তাঁর দাদা আবু জুনদুব আসাদ ইবনে আবদুল্লাহ তাঁর যুগে মক্কার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন।

আরকাম ইবনে আবিল আরকাম (রা.) ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণ করেন। বিখ্যাত সাহাবি আবু বকর (রা.)-এর দাওয়াতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। বর্ণিত রয়েছে, আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর উসমান ইবনে আফফান, তালহা ইবনে ওবাইদিল্লাহ, যুবাইর ইবনুল আওয়াম ও সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তাঁরা সবাই সাথে সাথে এ দাওয়াত কবুল করেন। পরদিন আবু বকর (রা.) উসমান ইবনে মাজউন, আবু ওবায়দা এবং আরকাম ইবনে আবিল আরকামকে নিয়ে নবিজির (সা.) কাছে যান। তাঁরাও সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন।

তাঁর বাড়ি ছিল পবিত্র কাবা ঘর থেকে মাত্র ১৩০ মিটার দূরে সাফা পাহাড়ের পাশে। তাঁর বাড়িটি ইসলামের ইতিহাসে দারুল আরকাম বা আরকামের বাড়ি নামে খ্যাত। ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রায় তিন বছর এই বাড়িটি ছিল মুসলমানদের গোপন শিক্ষাকেন্দ্র। এটিই ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র। এখানে সাহাবিরা গোপনে আল্লাহর রাসুলের (সা.) সঙ্গে দেখা করতেন এবং ইসলামের বিশ্বাস ও বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতেন।

হজরত ওমর (রা.) এই বাড়িতেই ইসলাম গ্রহণ করেন। ওমর (রা.) যখন তাঁর বোনের বাসায় কুরআন পাঠ করে অভিভূত হন এবং বুঝতে পারেন এটা আল্লাহর কালাম, ইসলাম সত্য ধর্ম, তখন তিনি তাঁর বোনকে বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) কোথায়? আমি তাঁর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করব। তখন তাঁর বোন বলেন, তিনি দারুল আরকামে বা আরকামের (রা.) বাড়িতে আছেন। ওমর (রা.) তাঁর বোনের বাসা থেকে দারুল আরকামে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। হজরত ওমরের (রা.) ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় মুসলমানদের শক্তি বেড়ে যায় এবং গোপনে ইসলাম প্রচার ও চর্চার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়।

ড. আলী মুহাম্মদ আস-সাল্লাবী, যাঁর জন্ম ১৯৬৩ সালে। লিবিয়ার একজন প্রখ্যাত ইসলামি ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সিরাত লেখক হিসেবে তিনি পরিচিত। তিনি মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উসুল আদ-দ্বীন ও দাওয়াহ বিষয়ে ডিগ্রি এবং সুদান থেকে তাফসির ও উলুমুল কুরআনে মাস্টার্স অর্জন করেন। তিনি গাদ্দাফি শাসনামলে কারাবরণ করেছিলেন এবং তিনি ড. ইউসুফ আল-কারদাভির ঘনিষ্ঠ ছাত্র।

ইতিহাসবিদ ড. আলী সাল্লাবি দারুল আরকামকে ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে দেখেন। এর কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেন।

আরকাম (রা.) মুসলমান হিসেবে পরিচিত ছিলেন না। তাই কারও ধারণা হতো না যে তাঁর বাড়িতে নবিজি (সা.) ও সাহাবিরা একত্র হতে পারেন। আরকাম (রা.) ছিলেন আবু জাহলের গোত্র বনু মাখজুমের সদস্য। বনু মাখজুমের সঙ্গে বনু হাশিমের দ্বন্দ্ব ছিল এবং বনু মাখজুমই ইসলামের বিরুদ্ধে বেশি সোচ্চার ও সক্রিয় ছিল। তাই তাঁর বাড়িতে একত্র হওয়ার সংবাদ প্রকাশ পেলেও ইসলাম বিরোধীরা বনু মাখজুমের একজন সদস্যের বাড়ি আক্রমণ করবে এ রকম ঝুঁকি কম ছিল।

ইসলাম গ্রহণের সময় আরকাম ইবনে আবিল আরকামের (রা.) বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। এত অল্প বয়সের কারও বাড়িতে মুসলমানরা একত্র হবে—এমন সন্দেহ পোষণের সম্ভাবনা কম ছিল।

আরকামের (রা.) বাড়ি কাবা ও ‘সাফা’ পর্বতের কাছে অবস্থিত হওয়ায় সেটা মুসলমানদের একত্র হওয়ার জন্য উপযোগী একটি জায়গা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। আরকাম (রা.) ছিলেন ওহি লেখকদের অন্যতম। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর মাধ্যমে কুরআন লিপিবদ্ধ করাতেন। সেজন্যই তাঁর বাড়িতে নবিজি (সা.) যেতেন এবং অন্য মুসলমানরাও সেখানে নবিজির (সা.) সাথে দেখা করতেন।

অর্থাৎ কোনো আদর্শের ভিত্তিতে বিপ্লব করতে নেমে বিপ্লবীরা নানান কৌশল অবলম্বন করতেন। ইসলামি আদর্শ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী হোক কিংবা অন্য কোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী হোক, তাঁরা নানা সময় নানা কৌশলী ধারণার অংশ হিসেবে গুপ্ত রাজনীতির প্রচলন ঘটান। এই কৌশল এত বেশিই কার্যকর যে, প্রতিপক্ষ তা সামাল দিতে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। স্বতন্ত্র, স্বকীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের ওপর বিজয় নিশ্চিত করা সহজ নয়।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।