লালদীঘির মাটিতে শত বছরের উৎসব


চারদিকে মানুষের ভিড়, বিক্রেতাদের হাঁকডাক, দর-কষাকষির শব্দ। কিন্তু এই সব কোলাহলের মাঝে এক জায়গায় নেমে এসেছে এক অদ্ভুত নীরবতা। বাঁশ ও বেতের পণ্যের স্তূপের মাঝে মাথায় বাঁশের তৈরি হ্যাট পরে বসে আছেন এক কারিগর। তাঁর হাত থামছে না, একটানা বুনে চলেছেন হাতপাখা। চারদিকে মানুষ আসছে-যাচ্ছে, কিন্তু তিনি যেন নিজের একটি আলাদা জগতে। এই দৃশ্যটিই আসলে চট্টগ্রামের লালদীঘির বৈশাখী মেলার সবচেয়ে সৎ পরিচয়। এটি কেবল কেনাবেচার মাঠ নয়, এটি লোকশিল্পের জীবন্ত প্রদর্শনী, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখা একটি ঐতিহ্যের উন্মুক্ত আয়না। আবদুল জব্বার স্মৃতি বলীখেলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই মহামেলা এবার ১১৭ বছরে পা দিয়েছে। কিন্তু এই মেলা কীভাবে এল, কার হাতে এর জন্ম, সেই গল্পটা জানলে এই কারিগরের নীরব হাতের অর্থ আরও গভীর হয়ে যায়।

এই মেলার জন্মকথা শুধু উৎসবের নয়, প্রতিরোধেরও। চট্টগ্রামের বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর যখন বলীখেলার সূচনা করেন, তখন সারা দেশে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ টগবগ করছে। তরুণদের সংগঠিত করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু সরাসরি পথে নয়। জব্বার সওদাগর তাই বেছে নিলেন এক অভিনব উপায়। খেলার মাঠে শরীর আর মনের শক্তি গড়ে তোলার আয়োজন করলেন। বাইরে থেকে দেখলে সেটি ছিল বিনোদন, কিন্তু ভেতরে লুকিয়ে ছিল প্রতিরোধের বীজ। সেই বীজ থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে আজকের এই মহামেলা। লালদীঘির ময়দান হয়ে উঠেছে তার চিরন্তন ঠিকানা।

ধীরে ধীরে বলীখেলাকে ঘিরে বসতে শুরু করে মেলা। মানুষ আসতে থাকে দূর থেকে, সঙ্গে আসে পণ্য, আসে গান, আসে জীবন। এখন প্রতি বৈশাখে ১২ তারিখ চট্টগ্রামের সেই পুরনো ময়দান পরিণত হয় এক জনসমুদ্রে। লালদীঘি মাঠ ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠে অস্থায়ী দোকানের সারি। আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের সামনে থেকে শুরু হয়ে কে সি দে রোড, সিনেমা প্যালেস মোড়, হাজারি গলি পেরিয়ে কোতোয়ালি মোড় পর্যন্ত যেন একটি পুরো শহর তৈরি হয়ে যায় নতুন করে।

গতকাল শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা শুরু হলেও দুই দিন আগে থেকেই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা দোকান সাজিয়ে বসেছেন। খাট-পালং থেকে ঝাড়ু, থালাবাসন থেকে দা-বঁটি-ছুরি, রঙিন খেলনা থেকে মাটির সূক্ষ্ম শিল্পকাজ, সবকিছুর এক বিশাল পসরা এখানে। এই মেলা শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি চট্টগ্রামের নিজের সঙ্গে প্রতি বছর একবার করে দেখা করার উপলক্ষ।

হাজারি গলিতে ঢুকতেই ভিড় আরও ঘন হয়ে আসে। হঠাৎ বাতাসে ভেসে আসে বাঁশির সুর, মিষ্টি অথচ টানটান। সেই সুর অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে দেখা মেলে রাজশাহীর গগন মণ্ডলের। সামনে নানা আকারের বাঁশি সুন্দর করে সাজানো। চার দশক ধরে তিনি এই পথ বেছে নিয়েছেন। মাঝেমধ্যে নিজেই বাঁশি তুলে সুর ছড়িয়ে দেন আশপাশে, আর সেই সুরের টানে মানুষ এসে দাঁড়ায়। বিক্রির পরিমাণ জানতে চাইলে তিনি হাসিমুখে বলেন, দশটা বাঁশি বিক্রি হলেই আমার চলে যায়। সংখ্যার হিসাবে তিনি আগ্রহী নন, কিন্তু সুরের হিসাবে তিনি ঠিকই জানেন, এই মেলায় তাঁর জায়গা আছে।

একটু এগোতেই ঝাড়ুর স্তূপের ওপর বসে আছেন জামাল উদ্দিন। চন্দনাইশ থেকে আসা এই মানুষটি প্রায় তিন দশক ধরে এই মেলায় আসছেন। কথা বলতে বলতে তাঁর গলায় এক ধরনের সহজ আস্থা ঝরে পড়ে। বলেন, ঝাড়ু তো সবার ঘরেই লাগে, তাই এই পণ্যের চাহিদা কখনো কমে না। প্রথম দিনেই তিন হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে আরও হবে বলে তাঁর বিশ্বাস। তাঁর কথায় বোঝা যায়, এই মেলা তাঁর কাছে শুধু একটি ব্যবসার সুযোগ নয়, বছরের একটি প্রতীক্ষিত মুহূর্ত।

কুমিল্লা থেকে মাটির পণ্য নিয়ে এসেছেন রুবেল মজুমদার। তাঁর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে একজন কিনছেন মাটির হাঁড়ি, আরেকজন হাতে তুলে দেখছেন কারুকাজ করা একটি ফুলদানি। রুবেল মজুমদার বলেন, এই মেলাটার জন্য সারা বছর অপেক্ষায় থাকি। শহরের মানুষ এখন আবার মাটির জিনিসের কদর বুঝতে পারছেন, আগের চেয়ে বিক্রি অনেক ভালো হচ্ছে। তাঁর পাশেই দাঁড়িয়ে বাঁশ ও কাঠের গৃহস্থালি পণ্যের বিক্রেতা আবদুল করিম। তিনি বলেন, প্লাস্টিকের জিনিসের ভিড়ে তাঁদের পণ্য হারিয়ে যাচ্ছিল একসময়। কিন্তু এখন মানুষ টেকসই জিনিস চাইছেন, এই মেলায় এসে সেই সাড়া পাচ্ছেন তিনি।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সামনে বসে আছেন কুষ্টিয়ার মোহাম্মদ সাজু। তাঁর সামনে সাজানো একতারা, দোতারা, ডুগডুগি। গরমে শরীর ভিজে যাচ্ছে ঘামে, তবু থামছেন না। মাঝেমধ্যে একতারা হাতে তুলে সুর তোলেন, আর আশপাশের মানুষ থমকে দাঁড়ায়। লালনের আখড়ার পাশে বেড়ে ওঠা সাজু নিজের হাতে এই বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন, তারপর বিক্রি করতে বেরিয়ে পড়েন দেশের নানা মেলায়। চট্টগ্রামের এই মেলায় আসছেন টানা আট বছর। বিক্রির ফাঁকে একটু আবেগ এসে যায় তাঁর কণ্ঠে। বলেন, এখানে শুধু ব্যবসা নয়, মানুষের সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়, মনের আনন্দও হয়।

কে সি দে রোডজুড়ে মাটির ফুলদানি, টব আর রঙিন শোপিসের পসরা সাজিয়ে বসেছেন অনেক বিক্রেতা। বহদ্দারহাটের রহিমা বেগম মেয়েকে নিয়ে এসেছেন বেলি ফুলের জন্য একটি টব কিনতে। দরদাম করে টব আর ফুলদানি কিনে নিলেন। বললেন, বারান্দায় গাছ লাগানোর শখ তাঁর পুরনো, ছোট জায়গাতেও একটু সবুজ রাখার চেষ্টা করেন। এই মেলা তাঁকে সেই সুযোগ দেয় সহজেই।

লালদীঘি মোড়ের কাছে খাবারের দোকানগুলোতে আলাদা ভিড়। মণ্ডা, মিঠাই, চানাচুর, আচার, টফি, মুড়ি-মুড়কির সুগন্ধ মিলেমিশে একটা আলাদা আবহ তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি ভিড় শিশুদের। হাটহাজারী থেকে আসা খাবার বিক্রেতা ওসমান গণি বলেন, ছোটরা থাকলেই বিক্রি ভালো হয়। প্রতি বছর তিনি এখানে আসেন, আর প্রতিবারই মনে হয় মেলা আগের চেয়ে বড় হচ্ছে।

নগরীর বাসিন্দা কলি আক্তার মাটির হাঁড়ি আর কাঠের খুন্তি কিনে হাসিমুখে বলেন, এগুলো ব্যবহারে যেমন ভালো, তেমনি এগুলো হাতে নিলে একটা পুরনো অনুভূতি জেগে ওঠে, মনে হয় শিকড়ের কাছে ফিরে এলাম। ষোলশহরের মো. রুবেল এসেছেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে। বলেন, বাচ্চারা যাতে নিজেদের সংস্কৃতিটা কাছ থেকে দেখতে পারে, সেজন্যই আনা। কিছু দেশীয় জিনিসও কিনলাম, তারা যেন জানে এই জিনিসগুলো আমাদেরই।

সাতকানিয়ার মো. হাসান প্রতি বছর এই মেলায় আসেন। তাঁর কথায় মেলার সারকথাটা যেন উঠে আসে। বলেন, জব্বারের বলীখেলা আর এই বৈশাখী মেলা চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের বড় একটি অংশ। এখানে এলে মনে হয়, পুরনো সংস্কৃতি এখনো জীবন্ত আছে। খেলা আর মেলার এই মিলনটাই সবচেয়ে বেশি টানে।

আজ শনিবার বেলা তিনটায় লালদীঘি ময়দানে রিংয়ে নামছেন ১০৮ জন বলী।। গত বছরের চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লার মো. শরীফ ওরফে বাঘা শরীফ এবারও নামছেন। নামছেন রানার্সআপ মো. রাশেদ ওরফে রাশেদ বলীও। দর্শকের মনে উত্তেজনা তাই একটু বেশিই। মল্লভূমিতে দুই যোদ্ধা যখন মুখোমুখি হবেন, তখন যে কেবল শরীরের শক্তির লড়াই হবে না, সেটা এই শহরের মানুষ জানে। সেই লড়াইয়ের পেছনে আছে একটি প্রতিশ্রুতি, যা ১১৭ বছর আগে একজন মানুষ দিয়ে গিয়েছিলেন।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে মেলার আলো জ্বলে উঠবে। দোকানে দোকানে বাতির আভায় পুরো এলাকা আলোকিত হয়ে যাবে। ভিড় কমার বদলে আরও বাড়বে। তরুণেরা ছবি তুলবেন, কেউ লাইভ করবেন, শিশুরা বায়না ধরবে খেলনার জন্য। পরিবার নিয়ে আসা মানুষ, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা তরুণ, আবার একাকী হেঁটে বেড়ানো মানুষটিও এই মেলায় কোথাও না কোথাও নিজের জায়গা খুঁজে পাচ্ছেন।

এই মেলার পথ কখনো মসৃণ ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় একবার বন্ধ হয়েছিল। করোনাভাইরাসের মহামারিতে টানা দুই বছর থামতে হয়েছিল। তবু প্রতিবার বিরতির পর নতুন উদ্যমে ফিরে এসেছে। কারণ এই মেলা কেবল একটি বার্ষিক আয়োজন নয়। এটি চট্টগ্রামের নিজস্ব পরিচয়, তার ইতিহাস আর ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রকাশ।

লালদীঘির মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন বলীরা লড়াই করেন, চারপাশে মানুষের কোলাহল, বাঁশির সুর, মাটির তৈজসপত্রের গন্ধ, শিশুর হাসি একসঙ্গে মিলে যায়, তখন বোঝা যায় এই উৎসব শুধু একটি মেলা নয়। এটি একটি শহরের নিজের সঙ্গে, নিজের অতীতের সঙ্গে, প্রতি বছর একবার করে করা কথোপকথন। সেই কথোপকথন থামেনি, থামবেও না।