
বৈশাখের তপ্ত রোদ মাথায় নিয়েও কেউ সরে যাননি। গামছা বেঁধে, ছাতা হাতে, গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ অপেক্ষা করেছেন একটি মুহূর্তের জন্য। চট্টগ্রামের লালদীঘি মাঠ যেন বছরের এই একটি দিনের জন্যই জেগে ওঠে নতুন প্রাণে। শনিবার ১২ বৈশাখ, ঐতিহাসিক জব্বারের বলী খেলার ১১৭তম আসরে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটল এক অসাধারণ মুহূর্তে— টানা তৃতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়নের মুকুট মাথায় তুলে নিলেন কুমিল্লার মো. শরীফ, যাঁকে সবাই চেনেন ‘বাঘা’ শরীফ নামে।
বেলা তিনটার দিকে বাঁশির শব্দে শুরু হয় মূল প্রতিযোগিতা। ঢোলের তালে তালে একে একে রিংয়ে উঠতে থাকেন বলীরা, আর গর্জে ওঠে চারপাশ। এ বছর চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০৮ জন কুস্তিগীর অংশ নেন এই আসরে। বাগেরহাট, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ— দেশের নানা কোণ থেকে আসা বলীরা নিজেদের শক্তি ও কৌশলের প্রমাণ দিতে নেমেছিলেন মাটির আখড়ায়।
নিয়ম অনুযায়ী গতবারের চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ, রানারআপ রাশেদসহ প্রথম চার জন সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনালে অংশ নেন। প্রথম রাউন্ড পেরিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বাগেরহাটের মামুন, কুমিল্লার দিপু, নারায়ণগঞ্জের নুরুল ইসলাম ও সাভারের মিঠু। কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইগুলো ছিল টানটান উত্তেজনায় ভরা। বাঘা শরীফ দিপুকে, রাশেদ মামুনকে, শাহজালাল নুরুলকে এবং মিঠু কামালের বিরুদ্ধে লড়েন সেই পর্বে।
সেমিফাইনালে প্রথম লড়াইয়ে রাশেদ বলী মাত্র দেড় মিনিটে হারিয়ে দেন মিঠুকে। অন্য সেমিফাইনালে বাঘা শরীফ সহজেই সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাহজালালকে পরাজিত করে ফাইনালের পথ নিশ্চিত করেন। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী খেলায় মিঠু ও শাহজালালের মধ্যে দীর্ঘ ১৭ মিনিটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই শেষে জয় পান মিঠু বলী।

ফাইনাল ঘিরে উত্তেজনা তখন তুঙ্গে। গতবারের পুনরাবৃত্তিতে আবারও মুখোমুখি বাঘা শরীফ ও রাশেদ বলী। শুরু থেকেই লড়াই ছিল সমানে সমান— কখনো শরীফ এগিয়ে যাচ্ছেন, আবার রাশেদ দ্রুত সামলে নিচ্ছেন। হাতের গ্রিপ, শরীরের ভারসাম্য, কৌশলের খেলায় দুজনেই ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। দর্শকেরা নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিলেন রিংয়ের দিকে। চারপাশে তখন শুধু চিৎকার আর ঢোলের শব্দ। দীর্ঘ ২৫ মিনিটের লড়াই শেষ দিকে এসে হঠাৎ মোড় ঘুরে যায়। কৌশল বদলে সামনে এগিয়ে যান শরীফ, রাশেদকে ভারসাম্য হারাতে বাধ্য করেন, এবং শক্ত এক চালে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেন। রেফারির বাঁশি বাজতেই ঘোষণা— হ্যাট্রিক চ্যাম্পিয়ন ‘বাঘা’ শরীফ।
ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই লালদীঘি মাঠ ভরে ওঠে হাততালি আর উল্লাসে। খেলার উদ্বোধন করেছিলেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। খেলা শেষে জয়ীদের পুরস্কার বিতরণ করেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান।
এই বলীখেলার শিকড় প্রোথিত আছে ইতিহাসের গভীরে। ১৯০৯ সালে, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে, চট্টগ্রাম শহরের বদরপাতির ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর এই অঞ্চলের তরুণদের সংগঠিত করতে এবং শারীরিকভাবে প্রস্তুত করতে লালদীঘি ময়দানে প্রথম এই কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। সেদিনের সেই দেশপ্রেমী উদ্যোগ আজ পরিণত হয়েছে চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় লোকজ উৎসবে। প্রতিবছর ১২ বৈশাখ লালদীঘি মাঠকে ঘিরে প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে তিন দিনের বৈশাখী মেলা বসে— কেনাবেচা, আড্ডা আর মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। এবার অবশ্য এসএসসি পরীক্ষার কারণে মেলার সময় একদিন কমানো হয়েছে।

শত বছরের বেশি সময় পেরিয়েও জব্বারের বলীখেলা চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ আর পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। আর সেই ঐতিহ্যের মাটিতেই শনিবার ইতিহাস রচনা করলেন বাঘা শরীফ— টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজেকে নিয়ে গেলেন কিংবদন্তির কাতারে।
