সিন্ডিকেটের রাজত্বে আমরা সবাই জিম্মি

মুদি দোকান
রমিজ সাহেব প্রতি শুক্রবার বাজারে যান। গত পনের বছর ধরে এই অভ্যাস তাঁর। কিন্তু এই শুক্রবার বাজার থেকে ফিরে তিনি চুপচাপ বসে রইলেন অনেকক্ষণ। স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? তিনি বললেন, ব্যাগটা হাতে নিয়ে দেখো, আগে কত কিছু আসত, এখন কত কম এসেছে। অথচ টাকা খরচ হয়েছে আগের চেয়ে বেশি। স্ত্রী কিছু বললেন না। শুধু রান্নাঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন। এই নীরবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা পরিবারের পুরো অর্থনৈতিক যন্ত্রণার গল্প।

রমিজ সাহেব একা নন। এই দেশের কোটি কোটি মানুষ এখন প্রতিদিন এই একই হিসাবের মুখোমুখি। চাল কিনবেন, নাকি ডাল? মাছ নেবেন, নাকি তেল? সব কিছু একসঙ্গে কেনার সামর্থ্য ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। দরিদ্র মানুষ প্রতিদিনের খাবার জোগাড়েই হিমশিম খাচ্ছেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো মাসের শেষে হিসাব মেলাতে পারছেন না। আর বাজারের ওপারে বসে কিছু মানুষ হিসাব মেলাচ্ছেন লাভের, নিশ্চিন্তে, নির্বিকারভাবে।

বাজারের বর্তমান চেহারাটা একটু দেখা যাক। মোটা চালের কেজি বেড়েছে পাঁচ টাকা। স্বর্ণা জাতের চাল এখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা। পাইজাম চাল ৬০ থেকে ৬৮ টাকা। মিনিকেট ৮৮ টাকা। ডালের কেজি ছুঁয়েছে ১৬০ টাকা। ডিমের ডজন এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১২০ থেকে লাফ দিয়ে উঠেছে ১৩০ টাকায়। বোতলজাত সয়াবিন তেল বাজার থেকে যেন উধাও হয়ে গেছে, আর খোলা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে লিটার ২১০ টাকায়। মাছের দাম কেজিতে বেড়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। সবজির বেশিরভাগই এখন ৮০ থেকে ১০০ টাকার ওপরে। এই তালিকা পড়তে পড়তে মনে হয়, এটা কোনো দ্রব্যমূল্যের তালিকা নয়, এটা একটা সাধারণ পরিবারের স্বপ্নের মৃত্যুর তালিকা।

এই যে দামের এত ওঠানামা, এর পেছনে কি কেবল জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি? বাস্তবতা বলে, পুরোটা নয়। খুচরা চাল বিক্রেতারাই বলছেন, জ্বালানির কারণে কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বাড়তে পারে, কিন্তু বাড়ানো হয়েছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা। বাড়তি এই দুই থেকে তিন টাকা কোথায় যাচ্ছে? কার পকেটে ঢুকছে? এই প্রশ্নের উত্তর সবাই জানেন, কিন্তু কেউ জোরে বলেন না। কারণ জোরে বললে বিপদ, চুপ থাকলে কেবল পকেট খালি হয়।

সয়াবিন তেলের গল্পটা আরও সরাসরি এবং আরও নির্লজ্জ। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি দেশের তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে দাম আরেক দফা বাড়াবে। তাই বাজারে বোতলজাত তেল সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চাহিদা বাড়িয়ে দাম বাড়ানোর এই পুরনো কৌশল এবারও কাজে লাগাচ্ছে তারা। সরকারের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে, আলোচনা হয়েছে, আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজারে তেল আসেনি। কারণ বৈঠকের টেবিলে কথা বলা আর বাজারে সরবরাহ দেওয়া এক জিনিস নয়। আর মুদি দোকানদার বসে আছেন খালি তাক নিয়ে। তাঁর কাছে আসছে তদারকি দল, জরিমানা গুনছেন তিনি। আর যারা সত্যিকারের কারসাজি করছে, তারা এসি ঘরে বসে চা খাচ্ছে এবং পরের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে।

এই ছবিটা নতুন নয়। শেখ হাসিনার সরকার পারেনি সিন্ডিকেট ভাঙতে। অন্তর্বর্তী সরকারও পারেনি। বর্তমান সরকার আশ্বাস দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সরকার বদলায়, মন্ত্রী বদলায়, প্রতিশ্রুতি বদলায়, কিন্তু সিন্ডিকেট বদলায় না। কারণ সিন্ডিকেটের শিকড় এত গভীরে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তাকে স্পর্শ করতে পারে না। বরং অনেক সময় দেখা গেছে, শুল্ক ছাড় বা মূল্য ঘোষণার নামে তাদেরই সুবিধা করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সিন্ডিকেট কেবল বাজারে নয়, নীতিনির্ধারণের টেবিলেও বসে থাকে।

সমস্যার কেন্দ্রে আছে একটি সহজ সত্য। উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছাতে যত হাত বদলায়, তার মধ্যে কোনো এক জায়গায় বা একাধিক জায়গায় ক্ষমতাশালী একটি চক্র বসে আছে। তারা বাজার নিয়ন্ত্রণ করে, দাম নির্ধারণ করে, সরবরাহ বাড়ায় বা কমায় নিজের ইচ্ছামতো। তারা কখনো মিল মালিক, কখনো আমদানিকারক, কখনো পাইকারি ব্যবসায়ী। পরিচয় বদলায়, কিন্তু কাজ একই থাকে। তদারকি সংস্থার লোকেরা জানেন তারা কারা। কোথায় থাকেন। কীভাবে কাজ করেন। তারপরও কিছু হয় না।

কেন হয় না? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে অস্বস্তিকর জায়গায় পৌঁছাতে হয়। ক্ষমতা আর বাণিজ্যের যে অলিখিত সম্পর্ক দশকের পর দশক ধরে গড়ে উঠেছে এই দেশে, তা ভাঙা অনেকের কাছে লাভজনক নয়। সিন্ডিকেট টিকে থাকলে একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের সুবিধা হয়। আর সেই শ্রেণি সব সরকারের আমলেই প্রভাবশালী থাকে, কারণ তারা কেবল বাজারে বিনিয়োগ করে না, রাজনীতিতেও বিনিয়োগ করে।

সমাধান কি তাহলে নেই? আছে। কিন্তু সেটার জন্য দরকার সদিচ্ছা এবং সাহস, দুটোই। প্রথম কাজ হলো কোন পণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে কারা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা চিহ্নিত করা। কত দামে আমদানি বা উৎপাদন হচ্ছে, কত দামে মধ্যবর্তী পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে, কোথায় অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে, এটা বের করা কঠিন নয়। তথ্য আছে, সক্ষমতা আছে, প্রযুক্তি আছে। শুধু টান দেওয়ার ইচ্ছাটুকু নেই। আর খুচরা পর্যায়ে জরিমানা করে বাজার নিয়ন্ত্রণের যে নাটক প্রতিবার মঞ্চস্থ হয়, সেটা বন্ধ করতে হবে। এই নাটকে ক্যামেরার সামনে দোকানদার জরিমানা দেন, পর্দার আড়ালে আসল কুশীলবরা হাসেন। এই হাসি থামাতে না পারলে বাজার কোনোদিন স্থিতিশীল হবে না।

রমিজ সাহেব আগামী শুক্রবারও বাজারে যাবেন। হয়তো ব্যাগ আরেকটু হালকা হবে, খরচ আরেকটু বাড়বে। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলবেন, মানিয়ে নেবেন। কারণ তাঁর কাছে বিকল্প নেই। কিন্তু যাদের কাছে বিকল্প আছে, যারা এই পরিস্থিতি বদলাতে পারেন, তাদের কাছে প্রশ্ন একটাই। লাগামটা তো হাতেই আছে। টানছেন না কেন?

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।