আক্রমণই সেরা রক্ষণ— হৃদয়ের দর্শনে ভর করে নতুন ইতিহাস বাংলাদেশের


চট্টগ্রামের আকাশে তখন মেঘ। স্কোরবোর্ডে ১৮৩ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য। পাওয়ারপ্লেতে টপ অর্ডারের হোঁচট। গ্যালারিতে দর্শকদের বুকের ভেতর একটা চাপা উদ্বেগ। ঠিক তখনই ক্রিজে নামলেন তাওহীদ হৃদয়— আর সঙ্গে নিয়ে এলেন একটি বিশ্বাস, একটি দর্শন। সেই দর্শনের নাম: আক্রমণই সেরা রক্ষণ।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ড্রেসিংরুমে কি প্যানিক ছিল? হৃদয় মৃদু হেসে বললেন, “না। আক্রমণাত্মক ক্রিকেটই ছিল একমাত্র উত্তর।” এই একটি বাক্যের ভেতর লুকিয়ে আছে পুরো ম্যাচের গল্প।

সাইফ হাসান ও তানজিদ হাসান তামিম কিছুটা মন্থর শুরু করেছিলেন। অধিনায়ক লিটন দাস ২১ রান করে ফিরে গেলে চাপটা আরও ঘন হলো। রান রেটের চাকা ঘুরছে, ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে— কিন্তু স্কোরবোর্ড যেন থমকে। ঠিক এই মুহূর্তে হৃদয় নিজের মনে একটা সিদ্ধান্ত নিলেন। পরে তিনি নিজেই জানালেন, “রান রেট কমে আসছিল। ওই সময়ে আক্রমণ না করলে ম্যাচ জেতা খুব কঠিন হয়ে যেত।”

হৃদয়ের ব্যাটিংয়ে সবসময়ই একটা নান্দনিক সৌন্দর্য আছে। বিশ্লেষক শামীম আশরাফ চৌধুরী যেমন বললেন, তিনি ক্রিজে এলেই দর্শকের প্রত্যাশা বেড়ে যায়। শরীরের ব্যালেন্স, শটের প্লেসমেন্ট, শক্তির সুষম ব্যবহার— সবকিছু মিলিয়ে হৃদয়ের ব্যাটিং যেন এক শিল্পকর্ম। আর সেই শিল্প এদিন রচিত হলো ২৭ বলে ৫১ রানের এক অনবদ্য হাফ সেঞ্চুরিতে— দুটি চার, তিনটি ছক্কা।

তবে হৃদয়ের গল্প শুধু তার নিজের রানের নয়। তিনি বুঝেছিলেন, বড় লক্ষ্য তাড়া করতে হলে একা কেউ ম্যাচ জেতে না। দরকার পার্টনারশিপ, দরকার সতীর্থদের আস্থা। পারভেজ হোসেন ইমন চার নম্বরে নেমে মাত্র ১৪ বলে ২৮ রানের ঝড় তুললেন। আর তারপর শামীম হোসেন— যে ঝড় তিনি বইয়ে দিলেন, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য।

শেষ ৩০ বলে ৪৮ রান দরকার। চাপের মুখে নিউজিল্যান্ড তখন আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু ১৬তম ওভারে নাথান স্মিথের বলে শামীমের সেই ‘নো লুক’ ছক্কা যেন পুরো মাঠের হাওয়া বদলে দিল। ওই ওভারেই এলো ১৮ রান। এরপর ১৭তম ওভারে শামীম একাই নিউজিল্যান্ডের বোলিং লাইনআপ তছনছ করে দিলেন— তিনটি চার, একটি ছক্কা, মাত্র এক ওভারে ২৫ রান। মাত্র ১৩ বলে ৩১ রানের এক টর্নেডো ইনিংস।

হৃদয় এই দুই পার্টনারের কথা বলতে গিয়ে আবেগে ভাসলেন। তিনি বললেন, পাঁচ বা ছয় নম্বরে ব্যাট করে সবসময় ফিফটি আসে না। কিন্তু দলের প্রয়োজনে সেই পজিশনে ১০ থেকে ২০ রানের কার্যকরী ইনিংস অনেক সময় একটি ফিফটির চেয়েও অনেক বেশি মূল্যবান। শামীম ও ইমন ঠিক সেটাই করেছেন। এটুকু বলেই তিনি আবার ফিরে গেলেন সেই বিশ্বাসে— আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আক্রমণই হলো সেরা রক্ষণ।

বোলিংয়েও বাংলাদেশ দাপট দেখিয়েছে। প্রথম ইনিংসে নিউজিল্যান্ডের কাটেনে ক্লার্ক ও ডেন ক্লিভার দুজনেই ফিফটি তুলে দলকে বড় রানের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, একসময় মনে হচ্ছিল দুইশোও পার হয়ে যাবে। কিন্তু মাঝপথে লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ৩২ রানে ২ উইকেট নিয়ে কিউই ইনিংসে ধস নামালেন। শেষমেশ নিউজিল্যান্ড আটকে গেল ৬ উইকেটে ১৮২ রানে। অভিষিক্ত পেসার রিপন মণ্ডল উইকেট না পেলেও শেষ ওভারে দারুণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন— সেটা হৃদয়ও স্বীকার করলেন গর্বের সঙ্গে।

ডেন ক্লিভার সংবাদ সম্মেলনে হার স্বীকার করলেন সৌজন্যের সঙ্গে। তিনি বললেন, বাংলাদেশের ব্যাটাররা ৩৬০ ডিগ্রিতে শট খেলেছেন, বাতাসের গতিবিধি বুঝে সেটাকে কাজে লাগিয়েছেন। প্রশংসা করলেন হৃদয়, শামীম ও ইমনের— বললেন এরা সত্যিকারের ‘ক্লাস’ দেখিয়েছেন। নিয়মিত উইকেট না পাওয়াই যে নিউজিল্যান্ডের মূল সমস্যা হয়েছে, সেটাও স্বীকার করে নিলেন নির্দ্বিধায়।

এই জয়ে একটি ইতিহাসও রচিত হলো। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এত বড় রান তাড়া করে আগে কখনো জেতেনি বাংলাদেশ। এর আগে কিউইদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ১৩৫ রান তাড়া করে জিতেছিল টাইগাররা। সেই রেকর্ড এখন অতীত।

তিন ম্যাচের সিরিজে ১-০ এগিয়ে বাংলাদেশ। কিন্তু এই জয়ের চেয়েও বড় যা পাওয়া গেল, সেটা হলো একটি দলীয় মানসিকতার দৃঢ় প্রকাশ। হৃদয় বললেন, দলে অনেক অভিজ্ঞ খেলোয়াড় আছেন যারা ৩০টির বেশি ম্যাচ খেলেছেন। তাই চাপ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এটা শুধু একটি দলের কথা নয়, এটা একটি প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের ঘোষণা।

দুই বছর পরে আসছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সেই যাত্রার পথে চট্টগ্রামের এই সন্ধ্যাটা হয়তো একটি ছোট্ট পদক্ষেপ মাত্র। কিন্তু এই পদক্ষেপের ভেতর রয়েছে একটি বড় বার্তা। তাওহীদ হৃদয়ের ভাষায় বলতে গেলে— আক্রমণই সেরা রক্ষণ। আর এই বিশ্বাসটুকু যতদিন থাকবে, বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বপ্নও ততদিন বড় হতে থাকবে।