মিরসরাইয়ে কালবৈশাখীর তাণ্ডব: বিদ্যুৎহীন অর্ধলাখ গ্রাহক, মোমবাতির আলোয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা


চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে অন্তত অর্ধশত গ্রাম। গাছপালা ভেঙে পড়ে প্রায় অর্ধশত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পুরো উপজেলা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বিদ্যুৎ না থাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোমবাতি জ্বালিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিতে হয়েছে। একই অবস্থা ছিল চলমান এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতেও, যেখানে পরীক্ষার্থীদের মোমবাতির আলোতেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এছাড়া রেললাইনে গাছ ভেঙে পড়ায় প্রায় আধা ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল।

সরেজমিনে দেখা যায়, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে উপজেলাজুড়ে হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড় শুরু হয়। ঝড়ের তাণ্ডবে খৈয়াছড়া ইউনিয়নের পূর্ব পোলমোগরা এলাকায় প্রবাসফেরত আবছারের এবং ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের কৃষক রেজাউল করিমের বসতঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

কৃষক রেজাউল করিম জানান, ঘরের ওপর একটি বড় গাছ পড়ে পুরো ঘর ভেঙে গিয়ে তার অনেক ক্ষতি হয়েছে। একই কথা জানান প্রবাসী নুরুল আবছারও।

বিদ্যুৎ না থাকায় মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে (মস্তাননগর) তৈরি হয় অচলাবস্থা। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইপিআই কর্মকর্তা কবির হোসেন জানান, ঝড়ে পুরো হাসপাতাল বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জেনারেটরটি গত দুই বছর ধরে নষ্ট এবং জ্বালানি তেলেরও নির্দিষ্ট বাজেট নেই। বাধ্য হয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসকরা মোমবাতি জ্বালিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে বিদ্যুৎ এলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

এদিকে ঝড়ের কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথেও বিঘ্ন ঘটে। চিনকী আস্তানা স্টেশনের মাস্টার সিরাজুল ইসলাম জানান, ঝড়ে রেললাইনের আপ ও ডাউন লাইনে দুটি গাছ ভেঙে পড়ায় প্রায় ৩০ মিনিট ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এ সময় ডাউন লাইনে পর্যটক এক্সপ্রেস এবং আপ লাইনে কর্ণফুলী এক্সপ্রেস আটকা পড়ে। পরে লাইন মেরামত কর্মীরা এসে গাছ সরিয়ে নিলে ট্রেন চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়। এছাড়া গ্রামীণ অনেক সড়কেও গাছ পড়ে সাময়িক যান চলাচল ব্যাহত হয়।

ঝড় ও বৃষ্টির কারণে উপজেলার মিঠাছরা বাজার, বারইয়ারহাট কাঁচাবাজার ও বারইয়ারহাট কলেজ গেট এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক দোকানে পানি ঢুকে পড়ায় বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। মিঠাছরা বাজারের সবজি ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হোসেন জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কোনো উন্নয়ন না করায় বৃষ্টিতে বাজারে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এতে অনেক সবজি নষ্ট হয়েছে। দ্রুত ড্রেন স্থাপন না করা হলে তারা আরও ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

কৃষিতে ঝড়ের প্রভাব প্রসঙ্গে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রতাপ চন্দ্র রায় জানান, এখানকার সবজিগুলো উঁচু এলাকায় চাষ হওয়ায় তেমন ক্ষতি হবে না। বৃষ্টি থামলেই পানি নেমে যায়। তবে আগামী ৪৮ ঘণ্টা ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা থাকায়, কৃষকদের বোরো ধানের ৮০ শতাংশ পাকলেই তা কেটে ঘরে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর মিরসরাই জোনাল অফিসের ডিজিএম আদনান আহম্মদ চৌধুরী এবং বারইয়ারহাট জোনাল অফিসের ডিজিএম হেদায়েত উল্ল্যাহ জানান, খুঁটি ভাঙার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও বহু জায়গায় গাছের ডাল ভেঙে পড়ে তার ছিঁড়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গাছ কেটে তার জোড়া দিয়ে দ্রুত বিদ্যুৎ সচল করার চেষ্টা চলছে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই ৭০ শতাংশ লাইন সচল করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।