চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা: প্রধানমন্ত্রীর দুঃখপ্রকাশ বনাম আমাদের আত্মসমালোচনা


মহান জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানের মুখে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধ মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগের সংক্ষিপ্ত আলোচনা শুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই অভাগা নগরীর মানুষের প্রতি দুঃখপ্রকাশ করেছেন। দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে এই উদার রাজনৈতিক বিনয় প্রদর্শন দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। আমরা চট্টগ্রামের মানুষ প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে এই সহমর্মিতা প্রকাশে কৃতজ্ঞ। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৭২ দিনের মাথায় এই শহরের জলাবদ্ধতায় কোনো দায় না থাকার পরও দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতাকে আমরা সাধুবাদ জানাই।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাকে অনেকেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে মনে করেন। অথচ এই জলাবদ্ধতা প্রাকৃতিক কোনো কারণে ঘটে না। আবার এই জলাবদ্ধতা কোনো সরকার সৃষ্টি করেনি। কোনো রাজনৈতিক দল এজেন্ডা নিয়ে এই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেনি। এই জলাবদ্ধতা তৈরির প্রধান কারিগর আমরাই। আমরা মানে চট্টগ্রামে বসবাসকারী মানুষ। কারণ আমরা চট্টগ্রামের প্রায় সকল খাল দখল করে নিয়েছিলাম। বাড়ি বানিয়েছি এই খাল দখল করে। আমরা আমাদের ব্যবহৃত পণ্যের উচ্ছিষ্টাংশ নালা-নর্দমা ও খালে ফেলে খালের যেটুকু অংশ জীবিত ছিল সেটুকু মেরে ফেলেছি! যে খালে ভেসে ভেসে শহরের ভেতর মালামাল নিয়ে বড় বড় ট্রলার আসত, তিলে তিলে সেসব খাল দখল করে সংকুচিত করে আমরা সেগুলোর অস্তিত্ব বিলীন করেছি। এই শহরের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছি।

সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে খালগুলো উদ্ধার করতে নেমেছে। বড় বড় খাল এখন বের হচ্ছে আমাদের বড় বড় ভবনের নিচ থেকে! কী নির্লজ্জ আমরা! কোনো সরকারের পক্ষেই জলাবদ্ধতা শতভাগ নির্মূল সম্ভব নয়, যদি না আমরা দখলবাজির মানসিকতা থেকে মুক্ত হই। প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ব্যক্তি উদ্যোগে খাল, নালা দখল করে স্থাপনা বানিয়েছেন, তেমনি প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ এই কাজ করেছেন। প্রভাবশালী নন, এমন মানুষও খাল দখল করেছেন।

নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্র বা সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার মতো উদার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের হয়নি। এক্ষেত্রে এই পরিস্থিতির নেপথ্যে প্রত্যক্ষ কোনো দায় না থাকার পরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুঃখপ্রকাশ করে সকল দায় নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই দুঃখপ্রকাশের মানসিকতাকে আমরা তাঁর আন্তরিক উপলব্ধি বলেই মনে করি। তিনি চাইলে এই ইস্যুতে বিগত সরকারের সমালোচনা করে দায় চাপাতে পারতেন।

আমরা অতীতে দেখেছি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র জলাবদ্ধতার জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দায়ী করতেন। আবার আবর্জনা অপসারণ পদ্ধতির ত্রুটিকে অজুহাত বানিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ দায় চাপাত সিটি করপোরেশনের ওপর। কিন্তু কারও ওপর দায় না চাপিয়ে চট্টগ্রামের মানুষের প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতা প্রদর্শন সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমানের বিনয়, বিচক্ষণতা এবং দায়বদ্ধতাকে প্রতিফলিত করেছে। তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় একজন প্রতিমন্ত্রী চট্টগ্রাম পরিদর্শন করেছেন। তাঁর এই উপলব্ধি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন, সুষম উন্নয়ন এবং পরিবেশ রক্ষায় এই সরকার আন্তরিক হবে।

এবার একটু আত্মসমালোচনা করি। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় উদ্ধার হওয়া খাল নতুন করে খননের পরও চট্টগ্রামের জনগণ এতে পলিথিন, প্লাস্টিকসহ আবর্জনা ফেলছে। কিছু কিছু নতুন খাল ভরাটও হয়ে গেছে।

অথচ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে আওয়ামী লীগ সরকার এসব খাল উদ্ধারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ কারণে বেশ কিছু খাল উদ্ধার হয়েছে। বলতে গেলে এ কারণে চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা অনেক কম হয়েছে। আমরা ছোটবেলায় আরও অনেক বেশি জলাবদ্ধতা দেখেছি। ১২-২৪ ঘণ্টায়ও অনেক এলাকায় তখন পানি নামেনি। এখনকার জলাবদ্ধতা তখনকার তুলনায় কিছুই না।

এই ইস্যুতে একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের পরামর্শ দেওয়ার আছে। একটি নগরী সমৃদ্ধ করতে কোনো জাদুবিদ্যা কাজ করে না। এটি স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা এবং নাগরিকের সুন্দর মানসিকতা লালনের মাধ্যমেই হয়। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি চট্টগ্রাম নগরীর উন্নয়নে ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) রয়েছে। মূলত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান তৈরি করে। এই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান মূলত একটি ‘ফাইলবন্দি’ পরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে। কারণ এই পরিকল্পনা প্রণয়নে কোটি কোটি টাকা বাজেট করে ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এটিকে বাস্তবে রূপ দিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে নেই এমন সবকিছুই ‘সাদা হাতি প্রকল্প’ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যেগুলো রাষ্ট্রের কাঁধে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জলাবদ্ধতা নিরসন ও বৃষ্টির পানি জমা রাখতে চট্টগ্রামে ৯টি বড় পরিসরের জলাধার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয় ২০০৮ সালে। চট্টগ্রামের মাস্টার প্ল্যান ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) এসব জলাধারের কথা উল্লেখ রয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি)। কিন্তু সিসিসির পক্ষ থেকে এসব জলাধার নির্মাণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সিসিসির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এসব জলাধার নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমির স্বল্পতা রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) বলছে, জলাধার নির্মাণের জন্য যেসব জায়গা সিডিএ-এর মাস্টার প্ল্যানে চিহ্নিত হয়েছে সেসব জায়গা এখন উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

জানা গেছে, নতুন তিনটি খাল নির্মাণের পাশাপাশি চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ৯টি বড় আকৃতিরসহ প্রয়োজনীয় নিম্নাঞ্চলে জলাধার নির্মাণের বিষয়ে চট্টগ্রাম ড্যাপে নির্দেশনা রয়েছে। ২০ বছর আগে ১৯৯৬ সালে প্রণীত সিডিএ-এর মাস্টার প্ল্যানেও এসব জলাধার নির্মাণের কথা উল্লেখ রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় ৯ হেক্টর জমিতে একটি ও চান্দগাঁও থানা এলাকায় ১০ হেক্টর জমিতে দুইটি জলাধার নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এ তিনটি জলাধার নির্মিত হলে লালখান বাজার এবং পাহাড়তলীর উজানের পানি এখানে জমা হয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। কিন্তু এসব জলাধার খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এছাড়া হালিশহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে পতেঙ্গা রোডের পূর্বপাশে একটি জলাধারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে ড্যাপে। আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকার পশ্চিমে মহেশখালের সঙ্গে ১ দশমিক ২ হেক্টর জমিতে আরও দুইটি জলাধার খননের পরিকল্পনা রয়েছে। নগরীর সদরঘাট খাল সংলগ্ন ছোট আকৃতির চারটি জলাধার খননের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একই সময়ে। এর বাইরে বাকলিয়ায় একটি ও চান্দগাঁও এলাকায় চারটি ছোট জলাধার নির্মাণের কথা। এ পাঁচটি জলাধার নির্মিত হলে চকবাজার ও জামাল খান এলাকার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা যাবে। একই সঙ্গে ওই এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনেও এসব জলাধার ভূমিকা রাখবে। ড্যাপ অনুযায়ী, সিসিসি জলাবদ্ধতা নিরসন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে। জলাধার নির্মাণের পর এর দায়িত্ব থাকবে চট্টগ্রাম ওয়াসার ওপর। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি সংকট নিরসনে এসব জলাধারের পানি ব্যবহার করবে।

কিন্তু একটি জলাধারও নির্মাণ করা হয়নি। কারণ হিসেবে আমাদের ধারণা, জলাধার, লেক কিংবা দিঘি- যাই বলি না কেন এসব অল্প পয়সার প্রকল্প। এসব প্রকল্পের জন্য তো আর হাজার হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। প্রকল্প যদি হাজার কোটি টাকার ওপরে না হয়, কিছু উপরি কামাই তো আর করা যায় না! তাই ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানভুক্ত জলাবদ্ধতা নিরসনের সহায়ক কম খরচের প্রকল্প কোনো সরকার হাতে নেয়নি।

এই চট্টগ্রাম আজ দুঃখের শহরে পরিণত হয়েছে। অপরিণামদর্শী প্রকল্পের কারণে পরিবেশ-বিপর্যয় ঘটেছে। পাহাড়-সবুজের শহরটি ইট-পাথরের রাজ্যে পরিণত হয়ে নাগরিকের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে। যে চট্টগ্রামের মানুষ হতে পারত সবচেয়ে সুখী, সে চট্টগ্রামের মানুষ আজ দুঃখ-বিলাস করে বেড়ায়। অপ্রাপ্তি, ব্যর্থতা আর কষ্ট নিয়ে অহেতুক স্মৃতি রোমন্থন করে করে বলে, একসময় আমরা অনেক ভালো ছিলাম।

লেখক: প্রাক্তন শিক্ষার্থী, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সহসভাপতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি।