‘তিন শত্রুর’ মুখে বঙ্গোপসাগর, বিপন্ন কোটি মানুষের আমিষ


চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সবুরের বয়স এখন ৫৮ বছর। জীবনের ৪০টি বছর তিনি কাটিয়েছেন বঙ্গোপসাগরের বুকে, জাল ফেলে মাছ ধরে। কিন্তু আজ তাঁর কণ্ঠে শুধুই হতাশার সুর। তিনি বলেন, “মেদ মাছ, ইলিশ, লাক্ষা, টেংরা আর চিংড়ি এখন সাগরে খুব কমই পাই। অনেক প্রজাতির মাছ আর নেই। শুধু তাদের নামটাই অবশিষ্ট আছে। এ কারণে মাছের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যাচ্ছে। জেলের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, কিন্তু মাছের সংখ্যা কমে গেছে। শুনছি অনেক মাছ ধরা নিষিদ্ধ হয়েছে। অবস্থা ভয়াবহ।”

সবুরের এই আক্ষেপ কেবল একজন প্রবীণ জেলের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, বরং এটি গোটা বঙ্গোপসাগরের এক নীরব বিপর্যয়ের প্রতিধ্বনি। যে সমুদ্র একসময় বাংলাদেশের কোটি মানুষের আমিষের চাহিদা মিটিয়েছে, অর্থনীতিতে অবদান রেখেছে, সেই সমুদ্র আজ ক্রমেই নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। আর এই শূন্যতার জায়গা দখল করে নিচ্ছে এক নতুন বাসিন্দা, জেলিফিশ। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে এখন জেলিফিশের সংখ্যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, আর এর বিপরীতে বাণিজ্যিক মাছের ভাণ্ডার শুকিয়ে আসছে দ্রুতগতিতে।

পরিসংখ্যান বলছে সংকটের গভীরতা কতটা। মৎস্য অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত মেরিন ফিশারিজ অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো বঙ্গোপসাগর থেকে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭ টন সামুদ্রিক মাছ আহরণ করেছিল। কিন্তু পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে এই পরিমাণ এক ধাক্কায় ৩১ হাজার ২৩৩ টন কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৪ হাজার ৮০৪ টনে। এক বছরের ব্যবধানে কমেছে প্রায় ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে জাতিসংঘ ও সরকারের যৌথ জরিপে, যেখানে দেখা গেছে গত সাত বছরে বঙ্গোপসাগরের মাছের মজুদ কমেছে প্রায় ৭৮ শতাংশ। ২০১৮ সালে যেখানে ছোট পেলাজিক মাছের মজুদ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার ১০০ টন, ২০২৫ সালে এসে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩৩ হাজার ৮১১ টনে।

এই সংকটের প্রতিফলন চট্টগ্রামের বাজারগুলোতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী আয়েশা আক্তার বছরের পর বছর ধরে থাইরয়েডের সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসক তাঁকে নিয়মিত সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু পরামর্শ মানতে গিয়ে তিনি বিপাকে পড়েছেন। বহদ্দারহাট মাছ বাজারে দাঁড়িয়ে আয়েশা জানালেন, “বহু বছর ধরে আমি সামুদ্রিক মাছ খাচ্ছি। কিন্তু শহরের বাজারে এর সরবরাহ ক্রমেই কমছে। আমি সামুদ্রিক চিংড়ি, লাক্ষা, সার্ডিন আর পোয়া মাছ পছন্দ করি। কখনো কখনো বিকল্প পাওয়া যায়, তবে খুব সীমিত পরিমাণে।” বহদ্দারহাট বাজারের মাছ ব্যবসায়ী সেলিম উদ্দিনও একই সুরে কথা বললেন। তিনি জানালেন, “লাক্ষা মাছ এখন একদমই নেই। অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ কিছু পাওয়া যায়, কিন্তু কিছু প্রজাতি আর পাওয়াই যাচ্ছে না। চাহিদা থাকলেও সরবরাহ নিয়ে আমাদের কিছু করার নেই।”

সংকটের পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো জেলিফিশের অস্বাভাবিক বিস্তার। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জৈবিক সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৌমিত্র চৌধুরী জেলিফিশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বঙ্গোপসাগরে এখন ১৬ প্রজাতির জেলিফিশ পাওয়া যায়, এবং তাদের সংখ্যা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।

সৌমিত্র চৌধুরী ব্যাখ্যা করলেন, “জেলিফিশের সংখ্যা মূলত বেড়েছে অন্যান্য মাছ কমে যাওয়ার কারণে। সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি জেলিফিশের জন্য উপকারী। দূষণ থেকেও তারা খাদ্য পাচ্ছে। সাগরে প্রচুর আবর্জনা ফেলা হচ্ছে, যা তাদের প্রজননের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করছে।”

তিনি আরও যোগ করলেন, “জেলিফিশ সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। একটি হলো অতিরিক্ত মাছ ধরা, আরেকটি ভুল ধরনের জাল ব্যবহার। জালে এমন ফুটো থাকার কথা যা দিয়ে কচ্ছপ বেরিয়ে যেতে পারবে। বড় মাছ আর কচ্ছপ জেলিফিশ খায়। তাদের ছাড়া জেলিফিশের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। আর জেলিফিশের সংখ্যা স্থিরভাবে বাড়তে থাকলে অন্যান্য মাছের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যেতে পারে।”

মেরিন ফিশারিজ সার্ভে ম্যানেজমেন্ট ইউনিটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দিলীপ কুমার সাহাও সংকটের বহুমুখী কারণ ব্যাখ্যা করলেন। তিনি বলেন, “সাগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলে জেলেদের অতিরিক্ত উপদ্রবের কারণে মাছ অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছে। দূষণও একটি বড় কারণ। এই অঞ্চলে জেলিফিশের সংখ্যাও বেড়েছে।”

বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিবেশগত সমুদ্রবিজ্ঞান ও জলবায়ু বিভাগের প্রধান আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া দূষণের বিষয়টিতে আলোকপাত করে বলেন, “দূষণ সামুদ্রিক প্রাণীদের জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলো পানি দূষিত করছে। সাগরে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। কখনো কখনো তেলও ফেলা হয়। আমাদের উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর জাহাজ চলাচল ও অতিরিক্ত মাছ ধরা চলছে। মাছ তাদের প্রয়োজনীয় পরিবেশ হারাচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাদা ও গোলাপি ডলফিন দেখা যেত, কিন্তু এখন আর দেখা যায় না।”

সংকটের পরিধি যে শুধু কয়েকটি মাছের প্রজাতিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা স্পষ্ট হয় পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাণিজ্যিক ট্রলারগুলো মাত্র ২ হাজার ৩৬৮ টন ইলিশ আহরণ করেছে, যা গত নয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সার্ডিন মাছের আহরণ অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে জেলেরা ৫০ হাজার ৭৮৩ টন সার্ডিন ধরেছিলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ২৩ হাজার ৬৫ টনে। চিংড়ির আহরণ গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাত্র ১ হাজার ৯৫৪ টন চিংড়ি ধরা পড়েছে। ২০১৮ সালে দেশের ২০টি প্রধান সামুদ্রিক মাছের প্রজাতির মধ্যে নয়টি বাণিজ্যিকভাবে আহরণযোগ্য ছিল। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে এই সংখ্যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র পাঁচে।

কক্সবাজার জেলা মৎস্যজীবী নৌকা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের কথাতেও ফুটে ওঠে এই সংকটের বাস্তব চিত্র। তিনি বলেন, “লাক্ষা, গুইজ্জা, তাইল্যা ও রূপচাঁদার মতো বেশ কিছু মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। অনেক জেলে এখন মাছ ধরা ছেড়ে দিয়েছেন। কারণ সামুদ্রিক মাছ ধরা একটি ব্যয়বহুল কাজ এবং খালি হাতে ফিরলে লোকসান বাড়তে থাকে।”

ওয়ার্ল্ডফিশ-এর ইকো ফিশ প্রকল্পের সহকারী গবেষক মো. বখতিয়ার রহমান জানালেন, “চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা অনুযায়ী, যা ২০২০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল, বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপগুলো দেখাচ্ছে অনেক প্রজাতির মাছের সংখ্যা কমেছে, কিছু প্রজাতির অনেক বেশি কমেছে।”

তিনি যোগ করলেন, “পাঁচশর বেশি জেলের সঙ্গে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি, চান্দনা ইলিশ, বিলাই পোমা, নাংলা, কাউয়া, টেংরা ও একথোতা মাছ সম্পূর্ণ হারিয়ে গেছে। প্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ মাছ ধরার জাল এবং সাগরে ছেঁড়া জাল ফেলে দেওয়া এর জন্য দায়ী।”

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সুব্রত সরকার বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক জীবন নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি জানালেন, “করাত মাছের মতো কিছু প্রজাতি প্রায় হারিয়ে গেছে। জেলেরা বিপন্ন প্রজাতিও ধরছেন, যা ধরা বাংলাদেশে অবৈধ। তবে বঙ্গোপসাগরে অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস ন্যূনতম এবং উদ্বেগজনক নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় লবণাক্ততা বৃদ্ধিই আসল কারণ। এতে মাছ ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবনের সমস্যা হচ্ছে। তাপমাত্রা বাড়ছে, তাই উৎপাদনশীলতা কমছে।”

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও সামুদ্রিক বিজ্ঞানী ড. সাইদুর রহমান চৌধুরী মন্তব্য করলেন, “লাক্ষা, মাইত্তা, তাইল্যা, রূপচাঁদা ও পোয়ার মতো দামি ও বড় আকারের মাছের প্রজাতি অত্যন্ত দুর্লভ হয়ে উঠেছে। বাজার পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা বছরের পর বছর ধরে বেশ কয়েকটি মাছের প্রজাতির ঘাটতি লক্ষ্য করছি। সাগরে তাদের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বহু প্রজাতির চিংড়িও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।”

তবে সংকট শুধু জৈবিক বা পরিবেশগত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারী ধাতু দূষণের এক নতুন মাত্রা, যা সম্প্রতি গবেষণায় উঠে এসেছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান এবং গবেষণা সহকারী কাজী নুসরাত জাহান উইশির গবেষণায় উঠে এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ভারী ধাতু দূষণের ভয়াবহ মাত্রা। ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আন্তর্জাতিক জার্নাল সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্টে প্রকাশিত এই গবেষণায় বাঁকখালী নদী এবং মহেশখালী চ্যানেলকে দূষণের প্রধান হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলাফল বলছে, ক্যাডমিয়াম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূষণকারী, যার সম্ভাব্য পরিবেশগত ঝুঁকির মান বাঁকখালী নদীতে ৩৩১.৯১ শতাংশ এবং মহেশখালী চ্যানেলে ২৯৫.৪৩ শতাংশ, যা অত্যন্ত উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “উপকূলীয় অঞ্চলে বিষাক্ত ধাতুর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বাংলাদেশের মৎস্য, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি। টেকসই মৎস্য এবং সুস্থ উপকূলীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতিমালা শক্তিশালী করা, কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশগত পর্যবেক্ষণ বাড়ানো অপরিহার্য।”

এই সব সংকটের মাঝে যে গোষ্ঠীটি সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছে, তারা হলো ভাসমান মান্তা সম্প্রদায়। তাঁরা সারা জীবন নৌকায় বসবাস করেন এবং একমাত্র মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। মাছের সংকট মানে তাঁদের অস্তিত্বের সংকট। সম্প্রতি ২০০ মান্তা পরিবারকে অস্থায়ী খাদ্য সহায়তা দেওয়া হলেও মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়ে গেছে, এই সাময়িক সহায়তা শেষ হলে কী হবে? ৫৮ দিনের মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞার সময় বাংলাদেশে প্রভাবিত জেলে পরিবারগুলো সাধারণত ৮০ কেজি চাল এককালীন সহায়তা হিসেবে পান। কিন্তু পিক ফিশিং সিজনে যাঁরা দৈনিক এক হাজার টাকা বা তার বেশি আয় করতে পারেন, তাঁদের জন্য এই সহায়তা প্রতীকী মাত্র। ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলায় ১ হাজার ৯৯৭ জন নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন, কিন্তু সহায়তা পান মাত্র ২৭৫টি পরিবার। কোস্ট ফাউন্ডেশনের ২০২৪-২০২৫ সালের মাঠ গবেষণা বলছে, আয়ের চাপে নিষেধাজ্ঞার সময় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ মাছ ধরা পরিবার অবৈধ বা ধ্বংসাত্মক জাল ব্যবহার করেন।

সমাধানের পথ নিয়েও বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট মত দিয়েছেন। মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক খ. মাহবুবুল হক মনে করেন, বাংলাদেশের সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন সীমিত থাকার কারণ হলো বেশির ভাগ মাছ ধরা চলে অগভীর উপকূলীয় জলে। তিনি বলেন, “নৌযানের সীমিত ক্ষমতা এবং অপর্যাপ্ত মাছ ধরার প্রযুক্তির কারণে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা কার্যকরভাবে গড়ে ওঠেনি। বর্তমান মাছ ধরার কার্যক্রম মূলত উপকূল থেকে ৭০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশ বিশ্বের সামুদ্রিক আহরণের মাত্র এক শতাংশ আহরণ করে।”

সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করে জানিয়েছেন, অতিরিক্ত মাছ ধরা, অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত চর্চা এবং ক্ষতিকর জালের ব্যবহার সামুদ্রিক মজুদ হ্রাসের পেছনে কাজ করছে। ২৭৩টি বাণিজ্যিক ট্রলারের মধ্যে ৭২টিতে ইকো সাউন্ডার রয়েছে এবং এই প্রযুক্তির অনুপযুক্ত ব্যবহার মজুদ হ্রাসে অবদান রাখছে।

বঙ্গোপসাগরের এই নীরব সংকটের সবচেয়ে করুণ মুখ হয়ে উঠেছেন বাঁশখালীর শেখেরখীল এলাকার ক্ষুদ্র জেলে ইব্রাহিম। নিষেধাজ্ঞার আগে যেখানে তিনি প্রতিদিন দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করতে পারতেন, এখন তাঁর হাতে কিছুই নেই। তিনি বলেন, “নিষেধাজ্ঞার আগে মাছ বিক্রি করে আমি দিনে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করতে পারতাম। এখন আমার কিছুই নেই।” সরকারিভাবে সুবিধাভোগীদের তালিকায় তাঁর নাম থাকলেও, সময়মতো সহায়তা পাননি তিনি। পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিতে অনেকের মতো তিনিও বাধ্য হচ্ছেন এমন উপায় খুঁজে নিতে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাস্তুতন্ত্রকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে, যেমন নদী ব্যবস্থায় সূক্ষ্ম-জালের ব্যবহার। ইব্রাহিমের গল্প বলে দেয় যে সমুদ্র যত নীরব হচ্ছে, ততই কোলাহলপূর্ণ হয়ে উঠছে উপকূলের জেলেপাড়াগুলোর হাহাকার।

আবদুস সবুর যাঁর কথায় শুরু হয়েছিল এই গল্প, আর ইব্রাহিম যাঁর কথায় শেষ হলো, তাঁদের দুজনের কণ্ঠেই শোনা যায় একই প্রশ্ন, বঙ্গোপসাগর কি আবার ফিরে পাবে তার হারানো জীবন, নাকি জেলিফিশের রাজত্বে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে কোটি মানুষের আমিষের ভাণ্ডার?