বাঁধ যেখানে নিজেই ভেঙে পড়ছে: পটিয়ার শ্রীমাই খালে ১৩৩ কোটির অপচয়


চট্টগ্রামের পটিয়ার ভাটিখাইন গ্রামের আবুল তালেব সকাল সকাল বাড়ি থেকে বের হন। ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান এবং ওয়ার্ড মেম্বার তিনি। হাঁটতে হাঁটতে শ্রীমাই খালের পাড়ে এসে দাঁড়ান। যা দেখেন, তাতে বুক ভারী হয়ে আসে। দুইদিনের বৃষ্টিতে বাঁধের গায়ে বসানো কংক্রিটের ব্লকগুলো সরে গিয়ে গড়িয়ে পড়েছে নিচে। আবুল তালেব আঙুল দিয়ে দেখান, “এই দেখেন, ব্রীজ এলাকার বাঁধটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষার পানির ঢলে এটা ধসে যেতে পারে। বাঁধের পাশেই ইউনিয়ন পরিষদ আর প্রাথমিক বিদ্যালয়। আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বারবার অনুরোধ করেছি, বাঁধটাকে আরও মজবুত করেন।”

কিন্তু কেউ শোনেনি।

পটিয়ায় শ্রীমাই খালের ওপর চলমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ১৩৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প এখন স্থানীয় মানুষের কাছে এক উৎকণ্ঠার নাম। তিন বছর আগে যে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল পানির স্তর নিয়ন্ত্রণ, সেচ ব্যবস্থা সহজ করা, বন্যা প্রতিরোধ এবং পানি সংরক্ষণের লক্ষ্যে, সেই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বাঁধ ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। মেয়াদ আছে আর মাত্র দুই মাস। অথচ পাঁচটি প্যাকেজের একটিও ৭০ শতাংশের ওপরে এগোয়নি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম পওর বিভাগ-১ এর তত্ত্বাবধানে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল এই কাজ। প্রকল্পের পরিকল্পনায় ছিল মাল্টিপারপাস হাইড্রোলিক এলিভেটর ড্যাম নির্মাণ, পাঁচটি প্যাকেজ, যার মধ্যে চারটি নদীতীর সংরক্ষণ আর একটি বনায়ন। কাগজে-কলমে সাড়ে চার কিলোমিটার খালের দুই পাশে বসানোর কথা ছিল ৩৫ গুণ ৩৫ গুণ ৩৫ ঘন সেন্টিমিটারের ৪ লাখ ১৩ হাজার ৫৯২টি ব্লক, এবং ৫০ গুণ ৫০ গুণ ২০ ঘন সেন্টিমিটারের আরও ২ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৩টি ব্লক। সঙ্গে ৫১০ মিটার সংযোগ সড়ক, ২১০ মিটার সেচ কাঠামো, একটি পানি নিষ্কাশন কাঠামো, ৩০০ মিটার খাল পুনঃখনন, দুই হাজার বর্গফুটের একটি কন্ট্রোল রুম এবং ৮৪ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি হাইড্রোলিক ড্যাম। প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের কথা ছিল প্রায় দুই একর।

কিন্তু মাঠের চিত্র বলছে অন্য গল্প।

বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেল, দুইদিনের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি আর হালকা ঝড়ের প্রভাবেই বাঁধের অসংখ্য ব্লক সরে গেছে জায়গা থেকে। খালের দুই পাশের বাঁধগুলোর কাজের মান এতটাই দুর্বল যে মাটি সরে গিয়ে ভেঙে পড়ার উপক্রম। কয়েকজন শ্রমিক ব্যস্ত মেরামতে। স্কেবেটর দিয়ে বাঁধের একদম কাছাকাছি জায়গা থেকেই মাটি কেটে আবার সেই মাটি দিয়েই বাঁধ ভরাট করা হচ্ছে। অর্থাৎ যে মাটির ওপর বাঁধ দাঁড়িয়ে আছে, সেই মাটিই কেটে নিয়ে বাঁধের গায়ে দেওয়া হচ্ছে। বর্ষার প্রথম স্রোতেই এই মাটি যে আবার ভেসে যাবে, সেটা স্থানীয় যে কেউ চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারেন।

ভাটিখাইন এলাকায় গিয়ে দেখা গেল, যেসব ব্লক বসানো হয়েছে, তার অধিকাংশের গায়ে ফাটল ধরেছে। মাত্র দুইদিনের বৃষ্টিতেই অনেক ব্লক বাঁধ ছেড়ে নিচে গড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় ছনহরা অংশের চিত্র আরও শোচনীয়। সেখানকার বাসিন্দারা বললেন, ভাঙনপ্রবণ যেসব জায়গায় ব্লক বসানোর কথা, সেসব জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। আর যেসব জায়গায় ভাঙনের কোনো ভয়ই নেই, সেখানে সারি সারি ব্লক বসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন? কারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোথায় ব্লক বসবে আর কোথায় বসবে না?

স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. সোহেলের কণ্ঠে স্পষ্ট ক্ষোভ। তিনি বললেন, “রাজনৈতিক তদবিরে এসব ব্লক বসানো হয়েছে। যা চরম অনিয়ম। যেসব জায়গায় বর্ষার পানির কারণে ভাঙন তৈরি হয়, সেসব জায়গায় যথাযথভাবে ব্লক বসানো হয়নি।” তাঁর কথায় ফুটে উঠল গোটা প্রকল্পের একটি কঠিন বাস্তবতা। জনগণের ১৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প কোনো প্রকৌশলগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব আর তদবিরের হিসাবে সাজানো হয়েছে।

কাজের তদারকিতে থাকা স্থানীয় মো. ইউনুছকে যখন প্রশ্ন করা হলো, “বাঁধের পাশের মাটি কেটে বাঁধে দিচ্ছেন, বর্ষার পানিতে এই মাটি তো সরে যাবে?” তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন, “স্থানীয়রা অভিযোগ করেছে, তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে মাটি ভরাট করা হচ্ছে।” বাকিটা তাঁর নীরবতা।

প্রকল্পের আরেকটি অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল হাইড্রোলিক ড্যাম এলাকায়। যেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নির্মিত হচ্ছে কোটি টাকার বাঁধ, ঠিক তার কয়েক গজ দূরে শ্রীমাই খালের একই বুক থেকে অবাধে বালু তুলে নিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। খাল থেকে বালু তুললে নদীর তলদেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়, ফলে যে বাঁধ সদ্য নির্মিত হচ্ছে সেটিরও ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। এ বিষয়টি জানা সত্ত্বেও প্রশাসন বা পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

স্থানীয়রা বলছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে এসে ঘুরে যান। কিন্তু কাজের তদারকি করেন না। ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকা চোখের সামনেই নষ্ট হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক, পানি উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রামের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খ.ম. জুলফিকার তারেকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল মোবাইল ফোনে। তিনি ফোন ধরেননি। অন্যদিকে পটিয়ার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার কর্মকর্তাদের গাফিলতির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বললেন, “প্রকল্পটি এখনো চলমান, কাজ এখনো শেষ হয়নি। কাজের কিছু ত্রুটি থাকতেই পারে। আমরা কাজগুলো দেখে ভুলভ্রান্তি ঠিক করে দেব।”

বাঁধের পাশ থেকে মাটি কেটে বাঁধ ভরাটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করলেন, “এরকম করার সুযোগ নেই। ভাটিখাইন এলাকায় বাঁধের পাশে মাটি একেবারেই নেই, খাড়া হওয়ায় এমন হয়েছে। অন্য জায়গা থেকে মাটি এনে ভরাট করা যায় কিনা দেখা হচ্ছে।” ড্যাম এলাকায় চলমান বালু উত্তোলন প্রসঙ্গে তিনি দায় ঠেলে দিলেন প্রশাসনের ঘাড়ে, “আমরা পটিয়ার সহকারী কমিশনার ভূমিকে বিষয়টি অবগত করেছি। উনারা বিষয়টি দেখবেন।”

কিন্তু সময় ফুরিয়ে আসছে। সামনে আরও মাত্র দুই মাস। তারপর শুরু হবে বর্ষা মৌসুম। যে বাঁধ এখনো নির্মাণ শেষই হয়নি, যেখানে বসানো ব্লকগুলোই সরে পড়ছে দুইদিনের বৃষ্টিতে, সেই বাঁধ বর্ষার ঢল কীভাবে সামলাবে, এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে নেই।

আবুল তালেব এখনো মাঝেমধ্যে শ্রীমাই খালের পাড়ে গিয়ে দাঁড়ান। বাঁধের ব্লকগুলো গুনে দেখেন, কয়টা সরে গেছে আজ। পেছনে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিশুরা ক্লাস করছে, কর্মকর্তারা কাজ করছেন, কেউ জানে না বর্ষায় এই বাঁধ ভেঙে পড়লে কী হবে। ১৩৩ কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সেখানে এখন শুধু ফাটল ধরা ব্লক, খাড়া বাঁধ থেকে গড়িয়ে পড়া কংক্রিট, আর স্থানীয় মানুষের অসহায় দৃষ্টি।

প্রশ্ন একটাই, এই প্রকল্পের সুফল আদৌ কেউ পাবে, নাকি বর্ষার প্রথম স্রোতেই ১৩৩ কোটি টাকা ভেসে যাবে শ্রীমাই খালের জলে?