যারা চট্টগ্রামকে ডুবিয়েছেন, তাদের হাতেই কি উদ্ধারের চাবি?


চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় সরকার বিভাগ ১৯ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কাগজে-কলমে এটি একটি বড় উদ্যোগ। কিন্তু আদেশের তালিকাটিতে চোখ বুলিয়ে নিলে একটি প্রশ্ন এড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে, এই কমিটি কি আসলে সমাধানের কমিটি, নাকি দায় ভাগাভাগির কমিটি?

আহ্বায়ক হিসেবে আছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র। সদস্য হিসেবে আছেন সিডিএর প্রতিনিধি, ওয়াসার এমডি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক), সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড, বন্দর কর্তৃপক্ষের চিফ হাইড্রোগ্রাফার, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, এমনকি কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির মহাব্যবস্থাপকও। সদস্যসচিব করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে।

তালিকাটি পড়ে মনে হতে পারে, সব সংস্থা এক ছাতার নিচে এসেছে, এবার বুঝি কাজ হবে। কিন্তু চট্টগ্রামের সংকটকে দীর্ঘদিন ধরে কাছ থেকে দেখা জেষ্ঠ্য সাংবাদিক সামচ্ছুদ্দিন ইলিয়াস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই কমিটিকে স্পষ্ট ভাষায় চিহ্নিত করেছেন ‘ক্লারিক্যাল কমিটি’ হিসেবে। তাঁর পর্যবেক্ষণটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি দেখিয়েছেন, সরকারি সংস্থার বাইরের কোনো স্বাধীন বিশেষজ্ঞ এতে অন্তর্ভুক্ত নন; নেই রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে থাকা কোনো নাগরিক প্রতিনিধি বা এই বিষয়ে অভিজ্ঞ সাংবাদিক। অর্থাৎ যাঁরা আছেন, তাঁরা সবাই সেই সংস্থাগুলোরই প্রতিনিধি, যাঁদের ব্যর্থতায় নগর জলে ডুবেছে, ড্রেনে পড়ে মানুষ মারা গেছে।

এই পর্যবেক্ষণকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। গত এক দশকে এই সংস্থাগুলোর প্রায় প্রত্যেকটিই চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিল। কেউ প্রকল্প নিয়েছে, কেউ অর্থ পেয়েছে, কেউ ঠিকাদার নিয়োগ করেছে, কেউ তদারকি করেছে। কিন্তু ফলাফল? প্রতি বর্ষায় চট্টগ্রাম ডুবেছে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের পরও পথে বসেছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। প্রশ্নটি তাই অনিবার্য, যাঁদের সম্মিলিত ব্যর্থতা চট্টগ্রামকে আজকের অবস্থায় এনে দাঁড় করিয়েছে, তাঁদেরই প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি গঠন করে কি প্রকৃত জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়?

১৯ সদস্যের এই তালিকায় একটি বিষয় বেদনাদায়কভাবে অনুপস্থিত। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কোনো শিক্ষাবিদ নেই, যাঁদের গবেষণা ও বিশ্লেষণ এই শহরের জলাবদ্ধতার মানচিত্র তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। নেই কোনো নগরপরিকল্পনাবিদ, নেই পরিবেশবিদ, নেই কোনো নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি। নেই সেই সাংবাদিকরাও, যাঁরা বছরের পর বছর মাঠে ঘুরে এই সংকটের নাড়িনক্ষত্র জেনেছেন। তালিকার ১৮ নম্বরে সিটি করপোরেশনের ‘খাল ও জলাবদ্ধতা বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে একজনকে রাখা হয়েছে, কিন্তু তিনিও সিটি করপোরেশনেরই। অর্থাৎ ১৯ জনের পুরো কমিটিতে এমন একজনও নেই, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার বাইরে দাঁড়িয়ে স্বাধীন মত দিতে পারেন।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার প্রকৃত সংকট কোথায়, সেটি বুঝতে হলে কমিটির ভাষায় নয়, শহরের বাস্তব ভূগোলে যেতে হবে। নগরের চিহ্নিত ৭৪টি খালের মধ্যে মাত্র ৩৬টি বর্তমান প্রকল্পের আওতায় এসেছে। বাকি ৩৮টি খাল কী অবস্থায় আছে, সেগুলোর কী হবে, এই প্রশ্নের উত্তর কমিটির কার্যপরিধিতে স্পষ্ট নয়। ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় প্রস্তাবিত রিটেনশন পন্ড বা জলাধারগুলো একে একে ভরাট হয়ে গেছে, সেই জমি এখন ভবন ও বাণিজ্যিক স্থাপনার নিচে। কেউ কি এই জলাধার পুনরুদ্ধারের সাহস দেখাবেন? কমিটিতে যাঁরা আছেন, তাঁদের অনেকের সংস্থাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই জলাধার হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে জড়িত।

আরেকটি বিষয় ভাবিয়ে তোলে। সিটি করপোরেশন ও সিডিএর রেষারেষি, দায় অস্বীকার ও সমন্বয়হীনতাই বছরের পর বছর চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতাকে গভীর থেকে গভীরতর করেছে। মেয়রকে যতটা জনতার মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, সিডিএ চেয়ারম্যানের ক্ষেত্রে সেটি ঘটে না বললেই চলে, অথচ অনেক ক্ষেত্রে দায় তাঁদেরই বেশি। এখন এই দুই সংস্থার কর্তারা যখন একই কমিটির সদস্য হয়ে বসবেন, তখন পুরোনো রেষারেষি কি হঠাৎ মিলিয়ে যাবে? নাকি কমিটির সভাকক্ষেই নতুন রূপে ফিরে আসবে?

কার্যপরিধি দেখলে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে। কমিটিকে বলা হয়েছে, খাল ও নালা সারা বছর সচল রাখা, উন্নয়ন ও সেবামূলক কাজের সমন্বয় করা, প্রয়োজনে সভা আহ্বান, প্রয়োজনে সরকারকে সুপারিশ, প্রয়োজনে কো-অপ্ট। প্রতিটি বাক্যে ‘প্রয়োজনে’ শব্দটির পুনরাবৃত্তি লক্ষণীয়। কিন্তু কমিটি কতদিন পরপর সভা করবে, তা নির্ধারিত নেই। কী ব্যর্থতায় কার জবাবদিহি, তা স্পষ্ট নয়। ব্যর্থ হলে পরিণতি কী, তারও কোনো উল্লেখ নেই। অর্থাৎ কমিটি গঠিত হয়েছে, কিন্তু কমিটির পারফরম্যান্স মাপার কোনো দাঁড়িপাল্লা তৈরি হয়নি।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে যে অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল, তার মূল কারণ ছিল জানুয়ারি মাস থেকেই প্রস্তুতি শুরু এবং কয়েকজন উপদেষ্টার ব্যক্তিগত মনোযোগ। সেই মডেলটি ছিল ফলাফলকেন্দ্রিক, কাঠামোকেন্দ্রিক নয়। বর্তমান কমিটি ঠিক উল্টো পথে হাঁটছে। কাঠামো তৈরি হয়েছে, কিন্তু ফলাফলের সময়সীমা নেই।

এই কমিটির সাফল্য নির্ভর করবে দু’টি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, কমিটি কি নিজেদের সংস্থাগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে চট্টগ্রামের নাগরিকদের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে? দ্বিতীয়ত, কমিটি কি স্বেচ্ছায় বাইরের বিশেষজ্ঞ, নাগরিক প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের কো-অপ্ট করে নিজের জবাবদিহিতার পরিধি বাড়াবে? কার্যপরিধির ‘চ’ অনুচ্ছেদে এই কো-অপ্টের সুযোগ রাখা হয়েছে, কিন্তু সেটি ‘প্রয়োজনে’। প্রয়োজন কে নির্ধারণ করবেন, সেই প্রশ্নটিই আসলে গোটা কমিটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

চট্টগ্রামের মানুষ এখন আর প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ হন না। তাঁরা সিঙ্গাপুরের গল্প শুনে শুনে ক্লান্ত। তাঁরা কোটি কোটি টাকার প্রকল্পের নাম মুখস্থ বলতে পারেন। কিন্তু প্রতি বর্ষায় দোকানের মালামাল ভেসে যাওয়ার দৃশ্যটিই তাঁদের একমাত্র সত্য। এই ১৯ সদস্যের কমিটি যদি সেই সত্য বদলাতে চায়, তবে প্রথম কাজ হবে নিজেদের আয়নায় দাঁড়ানো। যাঁরা ডুবিয়েছেন, তাঁরাই যদি উদ্ধারকর্তা হন, তবে অন্তত স্বীকার করতে হবে, এতদিন কোথায় ভুল হয়েছিল।

সেই স্বীকারোক্তি ছাড়া কমিটি যত সভাই করুক, যত প্রতিবেদনই তৈরি করুক, পরবর্তী বর্ষায় চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ-কাতালগঞ্জ-বাদুরতলার নিচতলা আবার পানিতে ডুববে। আর কোনো প্রতিমন্ত্রী এসে বলবেন, এটা জলাবদ্ধতা নয়, এটা জলজট।

চট্টগ্রামের মানুষ অবশ্য জানেন, নাম যা-ই হোক, পানি পানিই।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, একুশে পত্রিকা।