
রাত তখন সাড়ে দশটা। ঢাকার মিরপুরে নিজের ফ্ল্যাটে বসে টেলিভিশন দেখছিলেন রহিমা বেগম (৫৮)। হঠাৎ মোবাইলে কল। অপরিচিত নম্বর। ফোন ধরতেই শোনা গেল পরিচিত একটি কণ্ঠ — তাঁর ছেলে সজীবের। কণ্ঠে কান্না জড়ানো, গলা কাঁপছে: “আম্মা, আমি বিপদে পড়ছি। একটা অ্যাক্সিডেন্ট হইছে… হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। এখনই পঁচিশ হাজার টাকা লাগবে। তুমি বিকাশে পাঠাও, পরে ফোন করতেছি।” রহিমা বেগম হাত-পা কাঁপতে কাঁপতে টাকা পাঠিয়ে দিলেন। তারপর ছেলেকে ফোন করলেন— সজীব বলল, “আম্মা, আমি তো বাসায়ই আছি। কী হইছে?”
সেই কণ্ঠ সজীবের ছিল না। ছিল একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) তৈরি হুবহু নকল কণ্ঠ। এই গল্পটি কাল্পনিক, কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিন এমন ঘটনাই ঘটছে। প্রতারণার এই নতুন পদ্ধতির নাম ‘এআই ভয়েস ক্লোনিং স্ক্যাম’। সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান Moonlock-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এই ধরনের প্রতারণা আগের বছরের তুলনায় ১৪৮ শতাংশ বেড়েছে। আর বাংলাদেশের সাইবার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন — এই ঢেউ এখন আমাদের উপকূলেও এসে পৌঁছেছে।
তিন সেকেন্ডের কণ্ঠ— তৈরি হয় হুবহু নকল
ভয়েস ক্লোনিং প্রযুক্তি আজ এতটাই উন্নত যে, মাত্র তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ডিং থেকে এআই যেকোনো মানুষের কণ্ঠের হুবহু নকল তৈরি করতে পারে। আপনার সন্তান কি ফেসবুক বা ইউটিউবে কোনো ভিডিও দিয়েছে? হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস মেসেজ পাঠায়?— এটুকুই যথেষ্ট। প্রতারক সেই রেকর্ডিং কয়েকটি বিনামূল্যের বা স্বল্পমূল্যের এআই টুলে দিয়ে মিনিটের মধ্যে তৈরি করে নেয় আপনার প্রিয়জনের নকল কণ্ঠ।
এই প্রযুক্তি আর শুধু হলিউডের মুভিতে নেই। ElevenLabs, Murf, Resemble এআই-সহ কয়েক ডজন টুল আজ যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন— কোনো প্রযুক্তিগত দক্ষতা ছাড়াই। আর প্রতারকরা ঠিক এই সুযোগটাই নিচ্ছে। Moonlock-এর তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে এআই প্রতারণা বেড়েছে ১৪৮ শতাংশ। কণ্ঠ নকল করতে এআই-এর প্রয়োজন মাত্র ৩ সেকেন্ডের অডিও। দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরনের প্রতারণার ভুক্তভোগীদের ৮৫ শতাংশই নারী। আর ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী ডিপফেক ঘটনা বেড়েছে ১৭১ শতাংশ।
কীভাবে কাজ করে এই ফাঁদ?
প্রতারণার পুরো প্রক্রিয়াটি চারটি ধাপে চলে— এবং প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সুচিন্তিত। প্রথমে আসে টার্গেট খোঁজার পর্ব। প্রতারক সর্বপ্রথম শিকার বাছাই করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় পারিবারিক সম্পর্কের তথ্য (বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন) খুঁজে নেয়। ফেসবুক, ইউটিউব বা টিকটকে প্রকাশিত ভিডিও থেকে পরিবারের সদস্যের কণ্ঠ সংগ্রহ করে। দ্বিতীয় ধাপে সংগৃহীত অডিও এআই ভয়েস ক্লোনিং টুলে দেওয়া হয়। মিনিটের মধ্যে তৈরি হয় হুবহু সেই মানুষের কণ্ঠে যেকোনো বার্তা — “আব্বা টাকা পাঠাও”, “আম্মা বিপদে পড়ছি” ইত্যাদি।
তৃতীয় ধাপে আসে আবেগ কাজে লাগানোর কৌশল। ফোন করা হয় রাতে বা অপ্রত্যাশিত সময়ে— যখন মানুষ বিপদের কথা শুনলে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। বলা হয় অ্যাক্সিডেন্ট, গ্রেফতার বা হাসপাতালের কথা। সময় দেওয়া হয় না ভাবার— “এখনই পাঠাও না হলে বড় বিপদ হবে!” আর শেষ ধাপে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। বিকাশ, নগদ বা রকেটে টাকা পাঠাতে বলা হয়— কারণ ডিজিটাল মানি ট্রেস করা কঠিন। টাকা পৌঁছানোর সাথে সাথে প্রতারক নম্বর বন্ধ করে দেয়।
বাংলাদেশে কেন এই বিপদ বাড়ছে?
বাংলাদেশে এই প্রতারণার উপযুক্ত মাটি তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি কারণে। প্রথমত, ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে এবং অনেকেই পারিবারিক ছবি, ভিডিও ও ভয়েস মেসেজ অবাধে পাবলিক করে রাখেন। দ্বিতীয়ত, প্রবাসী শ্রমিক পরিবারগুলো দূরে থাকা সন্তান বা স্বামীর ফোন পেলে স্বাভাবিকভাবেই বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তৃতীয়ত, বিকাশ-নগদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক টাকা পাঠানোর সহজলভ্যতা প্রতারকদের কাজকে সহজ করে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পরিচিত কণ্ঠ শুনেই মানুষ বিশ্বাস করে ফেলে। এই প্রতারণায় প্রযুক্তির চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় মানুষের আবেগ— আর সেটাই সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
শুধু কণ্ঠ নয়— এখন মুখও নকল হয়
ভয়েস ক্লোনিং-এর চেয়েও ভয়ংকর আরেকটি প্রযুক্তি এসেছে— ডিপফেক ভিডিও কল। এতে শুধু কণ্ঠ নয়, হুবহু মুখমণ্ডলও নকল করা যায় রিয়েল-টাইমে। ভিডিও কলে আপনি দেখছেন আপনার পরিচিত মানুষের মুখ, কথা বলছে তার গলায়— অথচ সেটা সম্পূর্ণ কৃত্রিম। ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে বিশ্বব্যাপী ডিপফেক সংক্রান্ত ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ১৭১ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশে বিশেষ করে নারীদের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তির অপব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কারও ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে আপত্তিকর কনটেন্ট তৈরি করে সামাজিক হেনস্তা বা ব্ল্যাকমেইলের ঘটনাও রিপোর্ট হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এই ধরনের ঘটনার ৮৫ শতাংশ ভুক্তভোগী নারী।
আইনি সুরক্ষা কতটুকু আছে?
বাংলাদেশে ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন রহিত করে ২০২৫ সালে জারি হয়েছে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ। নতুন এই অধ্যাদেশে ডিজিটাল প্রতারণা ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে কঠোর বিধান রাখা হয়েছে। তবে সমস্যা হলো, অভিযোগ করার পদ্ধতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা এখনো অনেক কম। আর এআই-এর মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের তদন্ত ও প্রমাণ সংগ্রহ এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
সতর্কতা: এই লক্ষণগুলো দেখলে সাবধান
কিছু লক্ষণ আছে যা দেখলেই বুঝবেন কোনো গণ্ডগোল হচ্ছে। পরিচিত কণ্ঠে অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন এবং সাথে সাথে টাকা চাওয়া— এটি প্রথম সংকেত। “এখনই দাও, পরে কথা বলব”— সময় না দেওয়াটাও বড় লক্ষণ। বিকাশ/নগদ/রকেটে সরাসরি ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠাতে বলা, ভিডিও কলে চেহারা একটু ‘আড়ষ্ট’ বা নড়াচড়া অস্বাভাবিক মনে হওয়া, কণ্ঠে হালকা ‘রোবোটিক’ টান বা আবেগের সাথে মিল না থাকা, কিংবা প্রিয়জনের পরিবর্তে তৃতীয় কেউ ফোন ধরিয়ে দেওয়া — এগুলো সবই বিপদসংকেত।
নিরাপদ থাকুন: এই ৫টি অভ্যাস গড়ে তুলুন
প্রথমত, একটি কোড ওয়ার্ড তৈরি করুন। পরিবারে একটি গোপন ‘সংকেত শব্দ’ ঠিক করুন, যা ফোনে জিজ্ঞেস করলেই আসল মানুষ জানবে— প্রতারক জানবে না। দ্বিতীয়ত, থামুন এবং যাচাই করুন। টাকার কথা শুনলে আগে পরিচিত নম্বরে সরাসরি ফোন করে নিশ্চিত হোন। তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়ায় সতর্ক থাকুন। পরিবারের সদস্যদের ভয়েস বা ভিডিও পাবলিক না রেখে ‘Friends Only’ রাখুন। চতুর্থত, আবেগে ভেসে যাবেন না। “এখনই পাঠাও!”— এই চাপ অনুভব করলে বুঝবেন এটি ফাঁদ হতে পারে। পঞ্চমত, প্রতিবেশী-পরিবারকে জানান। বয়স্ক মা-বাবা, যাঁরা প্রযুক্তি কম বোঝেন, তাঁদের আগেই সতর্ক করুন।
বিপদে পড়লে কোথায় জানাবেন?
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই ধরনের প্রতারণার শিকার হন, তাহলে সরাসরি সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করুন। সাইবার পুলিশ সেন্টারে অভিযোগ জানাতে পারবেন তাদের ওয়েবসাইট (https://www.cid.gov.bd/cpc) বা হটলাইনের মাধ্যমে। বিকাশে প্রতারণার ক্ষেত্রে বিকাশ হেল্পলাইন ১৬২৪৭ নম্বরে যোগাযোগ করলে দ্রুত লেনদেন বন্ধ করা সম্ভব।
প্রযুক্তি প্রতিদিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। কিন্তু প্রতারকদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র এখনো প্রযুক্তি নয় — আপনার আবেগ। মনে রাখবেন, যে কণ্ঠ আপনাকে কাঁদায়, সে সবসময় সত্যি নয়। একটু থামুন, একটু যাচাই করুন — সেটুকুই আপনাকে রক্ষা করতে পারে।
